ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

হরমুজে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২১ মে, ২০২৬ ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


হরমুজে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার ইরানের

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পরিবহণের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে ইরান। এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে একটি জটিল, বহুমুখী ও স্তরভিত্তিক ছাড়পত্র ব্যবস্থা (ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম) কার্যকর করছে তেহরান।

 

ইরানের এই নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে কঠোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত যাচাই-বাছাই, দ্বীপ চেকপয়েন্টের মাধ্যমে নজরদারি, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াতের বিনিময়ে ‘ফি’ আদায় করছে ইরান।

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম মেনে চলার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ঝুঁকির তোয়াক্কা না করে অনেক দেশ ও শিপিং কোম্পানি ইরানের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করছে।

 

রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার ক্ষেত্রে ইরান একটি বিশেষ স্তরভিত্তিক অগ্রাধিকার পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এই ব্যবস্থায় প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ইরানের রাজনৈতিক মিত্র রাশিয়া ও চীনকে।

দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। আর তৃতীয় স্তরে রয়েছে বিশেষ দ্বিপাক্ষিক ও সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতাধীন জাহাজগুলো।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কযুক্ত জাহাজকে এই প্রণালী ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না।

 

কোনো জাহাজকে অনুমতি দেওয়ার আগে ইরানের শক্তিশালী ও এলিট সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) একটি বিশদ সম্পর্ক যাচাই করে বা 'অ্যাফিলিয়েশন চেক' পরিচালনা করে।

এজন্য ইরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ নামে একটি নতুন সংস্থাও গঠন করেছে। জাহাজমালিকদের কার্গোর মূল্য, ফ্ল্যাগ বা পতাকা, উৎস ও গন্তব্য, মালিকানার বিবরণ এবং ক্রুদের জাতীয়তা সম্পর্কিত সমস্ত নথি জমা দিতে হয়, যা যাচাই করতে আইআরজিসির প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা জাহাজে উঠে সরাসরি পরিদর্শনও চালায়।

এ ছাড়া উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে বের হওয়ার পুরো রুটটিতে ইরান আবু মুসা, গ্রেটার টান্ব এবং লারেকের মতো দ্বীপে একাধিক সামরিক চেকপয়েন্ট ও ওয়েপয়েন্ট স্থাপন করেছে। এসব চেকপয়েন্ট সশস্ত্র কর্মীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অনুমতিপ্রাপ্ত জাহাজগুলোকে আইআরজিসির দেওয়া নির্দিষ্ট কোঅর্ডিনেটস বা স্থানাঙ্ক এবং রুট কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। যাত্রাপথে অনেক সময় জাহাজগুলোকে তাদের অবস্থান নির্দেশক ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখতে এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী প্রণালীতে যাতায়াতের জন্য ফি নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও, ইরান নিরাপত্তা ও পরিষেবার নামে কার্গোর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন জাহাজের ওপর ‘নিরাপত্তা ও নেভিগেশন ফি’ ধার্য করছে। ইউরোপীয় শিপিং সূত্রের তথ্যমতে, যেসব দেশ বা জাহাজ জিটুজি চুক্তির আওতাভুক্ত নয়, তারা নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করছে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এবং আইআরজিসি-কে সুবিধা দিলে বিমা কভারেজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকায় এই অর্থ প্রদানের বিষয়টি কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

ইরানের এই কঠোর নীতির কারণে মে মাসের শুরুতেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ জাহাজ এবং ২২ হাজার ৫০০ নাবিক উপসাগরে আটকা পড়েন। এটি বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। এর বিপরীতে মার্কিন নৌবাহিনীও প্রণালীর বাইরে অবরোধ তৈরি করে ইরানি জাহাজের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যেখানে ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে বর্তমানে কেবল নামমাত্র কিছু জাহাজ পার হতে পারছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ইরাকি অপরিশোধিত তেলবাহী মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ ‘আজিওস ফ্যানুরিওস ১’-এর দুই দিনের অগ্নিপরীক্ষা ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের বাস্তবচিত্র তুলে ধরে। ১০ মে জাহাজটি আইআরজিসির অনুমতি নিয়ে রুট ধরে যাওয়ার সময় হরমুজ দ্বীপের কাছে চোরাচালানের সন্দেহে আইআরজিসির স্পিডবোট দ্বারা অবরুদ্ধ হয়। কয়েক ঘণ্টা তল্লাশির পর কোনো অর্থ প্রদান ছাড়াই (কূটনৈতিক চাপে) এটি মুক্তি পায়। তবে ইরানি জলসীমা পার হওয়ার পর এটি আবার মার্কিন নৌবাহিনীর ব্লকেডে ৬ দিন আটকে থাকে এবং অবশেষে ১৬ মে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার অনুমতি পায়।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, হরমুজ প্রণালী এখন সম্পূর্ণভাবে ইরানি সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক জোটের কারণে কেউ পার পাবে, কাউকে অর্থ দিতে হবে, আর কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে—এটাই এখন এই অঞ্চলের নতুন নিয়ম বা দ্য নিউ নরম।

সূত্র: রয়টার্স


   আরও সংবাদ