ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার
আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী গত ১ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার কথা ছিল সরকারের। অথচ তেলের দাম সমন্বয় না করেই গত ১১ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড অব গভর্নরসের বসন্তকালীন সভায় যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। জ্বালানির মূল্য সমন্বয় না করে সফরে যাওয়ায় আইএমএফের প্রতিশ্রুত ঋণের ১৮৬ কোটি ডলারের এক কানা কড়িও আনতে পারেননি অর্থমন্ত্রী।
এ কারণে দেশে ফিরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। সংস্থাটি সাফ বলে দিয়েছিল, শর্ত পূরণ করতে না পারলে আইএমএফের কাছ থেকে বর্ধিত ঋণ সহায়তা প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এই শর্তের মধ্যে রয়েছে, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া সকল ক্ষেত্রে ভতুর্কি প্রত্যাহার, কর ছাড় রদ এবং ভ্যাটের অভিন্ন হারের প্রবর্তন।
এই শর্তগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে পিছিয়ে ছিল।
তবে শনিবার (১৮ এপ্রিল) প্রধান চারটি জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে সরকার। এর কারণ হিসেবে আইএমএফের শর্তের বিষয়টি সামনে আসে।
অথচ অর্থমন্ত্রী আইএমএফের সভা থেকে খালি হাতে ফিরে রোববার (১৯ এপ্রিল) গণমাধ্যমকে বলেছেন, আইএমএফের চাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। বৈশ্বিক পরিস্থিতে জ্বালানির দাম বাড়াতে হয়েছে। তিনি শর্তের দায় খোলামেলা ভাবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের উপর চাপিয়েছেন।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই আইএমএফের ঋণ চুক্তিটি হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরেই এই ঋণের কিস্তি পাওয়া নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে রশি টানাটানি চলছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের দেওয়া শর্তের দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশকে বাড়তি ঋণ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তি জুন মাসেও ছাড় করা হবে না।
বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন সভার পাশাপাশি সাইডলাইনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষীক বৈঠক করছেন। সেই বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে শর্তের বিষয়গুলো জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠকের বিষয়ে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চলমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অন্ততপক্ষে ১০০ কোটি ডলার বাড়তি সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এই অর্থ বাজেট সহায়তা হিসেবে জুনের আগেই দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়।
আইএমএফের পক্ষ থেকে চলমান সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট মোকবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। কিন্ত চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্ত মোতাবেক প্রতিমাসেই জ্বালানির দাম সমন্বয়ের কথা রয়েছে। দাম সমন্বয় না করার কারণে ইতোমধ্যে ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। যা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।
সূত্র জানায়, চলমান ঋণচুক্তির দুটি শর্ত বাস্তবায়নের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। শর্ত দুটি হলো, সব ধরনের কর-ছাড় সুবিধা বাতিল করে ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিম্ন আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা। এই দুটি শর্ত বাস্তবায়ন করলে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ঋণ ছাড় করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী অস্বীকার করলেও জানা যায়, আইএমএফের শর্ত পূরণ না করলে ঋণের বকেয়া বাড়তি ঋণ সহায়তা তো দূরের কথা ঋণের বকেয়া কিস্তির অর্থও পাওয়া যাবে না। আর এ কারণে দেশে ফিরেই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে, উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফ ইতোমধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক ২৫ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে। মূলত এই তহবিল থেকেই বাংলাদেশ বাড়তি সহায়তা চেয়েছে।
উল্লেখ্য, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ইউএস ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। আইএমএফের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তারা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করবে। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, আগামী জুনে আইএমএফ ঋণের ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি একবারে ছাড় করতে পারে।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এই চাহিদার ৭৩ শতাংশ পূরন হয় ডিজেল দিয়ে। ডিজেলের প্রায় পুরোটায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে অকটেনের চাহিদার অর্ধেকের বেশি এবং পেট্রোলের পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়।
গত শনিবার ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ায় সরকার। নতুন এ দাম রোববার থেকে কার্যকর হয়। এ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন সমন্বয়ে ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে, এতে লিটারে ১৮ টাকা বেশি গুনতে হবে ভোক্তাকে।
অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে, এখানে লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি দেখা গেছে। আর পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে, লিটারে বেড়েছে ১৯ টাকা।