ঢাকা, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার ও পুরুষ নির্যাতন: এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৭ মার্চ, ২০২৬ ১২:০১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১০ বার


নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার ও পুরুষ নির্যাতন: এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সাম্যের সমাজ গঠনে আইনের শাসন অপরিহার্য। রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো দুর্বলের সুরক্ষা ও সবলের অন্যায় দমনের ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করবে—এটাই আদর্শ। বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০০ সালে প্রণীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (Nari O Shishu Nirjatan Daman Ain, 2000) নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই আইনের ধারা ৯ (ধর্ষণ), ধারা ১০ (যৌন হয়রানি) এবং বিশেষ করে ধারা ১১ (যৌতুকের জন্য হত্যা বা আঘাত) এবং দণ্ডবিধির ৪৯৮ক ধারা (স্বামী বা তার আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতন) হাজার হাজার নারী-শিশুর জীবন রক্ষা করেছে। তবে বিগত দুই দশকের বিচারিক অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান একটি রূঢ় বাস্তবতা উন্মোচিত করেছে: এই আইনের সুরক্ষাকবচ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, পারিবারিক কলহ কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থের ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

অপব্যবহারের চিত্র: তথ্য ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের আইন ও সামাজিক গবেষণায় স্পষ্ট যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলার একটি বড় অংশই মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত। সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ২০১৯ সালে সংসদে বলেছিলেন, “৮০ শতাংশ নারী নির্যাতন মামলা মিথ্যা এবং যৌতুক-সংক্রান্ত মামলার ৯০ শতাংশই ভুয়া।” একাধিক স্বাধীন গবেষণায় দেখা গেছে, এই আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলার ৬০-৭০ শতাংশই অভিযোগ প্রমাণিত হয় না এবং আদালতে খারিজ হয়। ফলে নিরপরাধ পুরুষ, তাঁর পরিবার—এমনকি বয়স্ক মা-বাবা ও শিশু সন্তান—দীর্ঘ বছর আইনি হয়রানি, জেল, চাকরি হারানো ও সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন।

আইনের ধারা ১৭ স্পষ্টভাবে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরকারীর শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ প্রায় নেই। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রাথমিক তদন্তের পর্যায়েই সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত জীবন ও পারিবারিক শান্তি হারিয়ে ফেলেন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ২০১৪ সালের অর্ণেশ কুমার বনাম বিহার মামলায় একই ধরনের যৌতুক আইনের (৪৯৮এ) অপব্যবহারকে “legal terrorism” বা আইনি সন্ত্রাস বলে অভিহিত করেছেন—যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সমান প্রাসঙ্গিক।

 

মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি: নীরব সংকট

মিথ্যা অভিযোগের শিকার পুরুষদের মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের আইনি হয়রানি পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে দেয়। একজন চাকরিজীবী বা সাধারণ নাগরিক যখন মামলার জালে আটকে পড়েন, তখন তাঁর জীবন এক দীর্ঘস্থায়ী গোলকধাঁধায় পরিণত হয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—প্রকৃত নির্যাতিত নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত করে, কারণ আদালতের সময় ও সম্পদ অপচয় হয়।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ:

জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR) এর অনুচ্ছেদ ১২ (ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষা) ও ১৭ (সম্পত্তির অধিকার) এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR) এর অনুচ্ছেদ ১৪ (স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার) অনুসারে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশও এসব সনদের স্বাক্ষরকারী। অথচ বর্তমান আইনি প্রক্রিয়ায় লিঙ্গ-নিরপেক্ষতার অভাব এই অধিকার লঙ্ঘন করছে।

 

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টান্ত:

যুক্তরাজ্যের Domestic Abuse Act 2021 পুরোপুরি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ (gender-neutral)—পুরুষ, নারী, সমকামী কিংবা ট্রান্সজেন্ডার যেকোনো ব্যক্তি এর আওতায় সুরক্ষা পান। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপের অনেক দেশও পারিবারিক সহিংসতার আইনকে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করেছে। অপরাধের কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় নেই—এই সত্যকে স্বীকার করে বাংলাদেশেও আইনি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

 

প্রস্তাবিত সংস্কার: আন্তর্জাতিক মানের পথ

১. মামলা গ্রহণের আগে ‘ফলস কমপ্লেইন্ট যাচাই কমিশন’ গঠন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত উইংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক সত্যতা যাচাই।

২. ধারা ১৭-এর কঠোর প্রয়োগ এবং মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিধান।

৩. আইনকে আরও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করা—পুরুষ নির্যাতনের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা।

৪. পুলিশ ও আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল তদন্ত ব্যবস্থা।

৫. ক্ষতিগ্রস্ত নিরপরাধ ব্যক্তির জন্য আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিপূরণের আইনি পথ।

এই সংস্কার শুধু নিরপরাধ পুরুষদের রক্ষা করবে না, বরং প্রকৃত নির্যাতিত নারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। আইনের অপব্যবহার প্রকৃত ভুক্তভোগীর বিশ্বাসও নষ্ট করে।

 

উপসংহার:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে তার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব। একটি সুষম, স্বচ্ছ ও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোই পারে সমাজ থেকে ‘আইনি হয়রানি’ নির্মূল করে একটি সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সংস্কার সম্ভব—যাতে আইন সত্যিকার অর্থে ‘ঢাল’ হয়, ‘অস্ত্র’ নয়।

এই বিশ্লেষণ শুধু একটি আহ্বান নয়—এটি একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজের দাবি। সময় এসেছে পরিবর্তনের।

 

এম. এ. এ. বাদশাহ্ আলমগীর

Advocate

The Subordinate Courts of Bangladesh

Associated with practice at the High Court

Legal Advisor,

Aparadhchokh24.com

Email: [email protected]


   আরও সংবাদ