ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৮ মার্চ, ২০২৬ ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৫ বার
ঢাকা: একের ভেতর দুই। পাওয়ার (বিদ্যুৎ) ও প্রোটিন (আমিষ)। এই দুই শব্দের অদ্যাক্ষরে রয়েছে ‘পি’। আর এই ডাবল ‘পি’ নিশ্চিত হবে নতুন সরকারের খালকাটা কর্মসূচিতে।
যেখানে একদিকে রাষ্ট্রের রুগ্ন বিদ্যুৎ খাত হবে সবল আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের দরিদ্র পীড়িত জনগোষ্ঠী পাবে প্রোটিন বা আমিষের যোগান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশজুড়ে পুনরুজ্জীবিত এই খালকাটা কর্মসূচি শুধু পানি ব্যবস্থাপনাই নয়, বদলে দিতে পারে দেশের বিদ্যুৎ খাতের চিত্র, বাড়াতে পারে প্রোটিনের যোগান। তারা বলছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উদ্যোগকে ভিত্তি করে বর্তমান সরকার যদি দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল নেটওয়ার্কের মাত্র ১০ শতাংশও কাজে লাগাতে পারে, তবে উৎপাদিত হবে কয়েক গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, পাশাপাশি প্রতিটি খালে মাছ চাষের মাধ্যমে পূরণ হবে দেশের প্রোটিনের চাহিদাও। রক্ষা পাবে জমি, বিদ্যুৎ ও এলএনজি আমদানিতেও প্রতিবছর আর ব্যয় করতে হবে না বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
খালের ওপর সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই নজির বিশ্বে নতুন নয়। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ইলেকট্রিক জেনারেটিং অথরিটি অব থাইল্যান্ড (Electricity Generating Authority of Thailand) জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর ভাসমান সোলার স্থাপন করে একটি হাইব্রিড মডেল তৈরি করেছে।
এই জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্পটি, সেচের পানি সরবরাহ আর কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রজেক্ট নেক্সাস (Project Nexus) নামে একটি প্রকল্প চালু আছে, যেখানে ক্যালিফোর্নিয়া খালের ওপর ছাউনি আকারে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশ্লেষক ও নীতি-পরামর্শক কায়ছার চৌধুরী বলেন, সাধারণত যে কোনো পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্ষেত্রে বিঘার পর বিঘা জমি লাগে। এমতাবস্থায় আমাদের শত শত বিঘা জমি যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আটকে থাকে তাহলে খাদ্য, পুষ্টি ও বাসস্থান সবই নিকট ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়বে। আবার এই অধিক পরিমাণ জমি একক মালিকানা না হওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটিও বেশ সময় সাপেক্ষ ও জটিলতাপূর্ণ হয়। অন্যদিকে এলএনজি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র কতটা অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ সেটা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সুতরাং সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খালের ওপর সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
যেখানে একই সাথে খালে মাছ চাষ আর ওপরে থাকবে সোলার প্যানেল, যার মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে কৃষি জমিতে সেচসহ নানা কাজে ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করবে মাছ আর বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণ করবে সোলার প্যানেল। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ‘সোলার ওভার ক্যানেল’ বাস্তবায়ন করতে পারলে নিশ্চিত টু পি- প্রোটিন অ্যান্ড পাওয়ার।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে কাজ করা প্রকৌশলী ফরিদ হোসেন পাঠান বলছেন, কৃষিজমিতে খাল খনন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জমিতে সেচ দেওয়া, আর যে পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হবে সে পাম্পটি কিন্তু চলবে বিদ্যুতে, এখন যদি আমরা খালের ওপর সোলার বসিয়েই সেই বিদ্যুৎ পাই তবে তো আর আমাদেরকে জাতীয় গ্রিড থেকে কোনো বিদ্যুৎ নিতে হবে না। বর্তমানে সারাদেশে আমরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সেচ কাজে ব্যবহার করি তার একটা বড় অংশ যখন সোলার থেকে আসবে তখন জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, আর স্বাভাবিকভাবেই লোডশেডিংও তেমন একটা করতে হবে না। ফলে শিল্পখাত এবং দৈনন্দিন জীবন উভয় ক্ষেত্রেই আসবে স্বাচ্ছন্দ্য, স্বস্তি। এছাড়া খালে মাছ চাষ, খালের পাড়ে সবজি চাষ এগুলোর মাধ্যমেও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে আর উপকৃত হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
দীর্ঘদিন সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এক্সিলন বাংলদেশে লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবতাহী ইসলাম শুভ বলেন, প্রথমত খালের ওপর সোলার বসালে আলাদা জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না, ফলে সামাজিক বিরোধ ও ক্ষতিপূরণ সমস্যা অনেকাংশে কমবে। দ্বিতীয়ত, পানির ওপর ভাসমান সোলার প্যানেল ব্যবস্থায় পরিবেশ ঠান্ডা থাকে, ফলে তুলনামূলকভাবে স্থলভিত্তিক সোলারের চেয়ে এসব প্যানেলের কার্যক্ষমতা ৫–১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
তৃতীয়ত, আরো একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে পানি সংরক্ষণ। খালের ওপর সোলার প্যানেল ছায়া তৈরি করে, ফলে পানির বাষ্পীভবন কমে যায়। সেচনির্ভর এলাকায় বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে এটি বাস্তবায়িত হলে ওই এলাকার পানি সংকট অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
তবে অপার সম্ভাবনাময় এই ‘সোলার ওভার ক্যানেল’ প্রকল্পে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষক কায়ছার চৌধুরী ও আবতাহী ইসলাম শুভ। তারা বলছেন, প্রথমত প্রথমিক ব্যয়ের চ্যলেঞ্জ, কারণ ভাসমান কাঠামো, অ্যাঙ্করিং সিস্টেম, জং-প্রতিরোধী উপকরণ, সব মিলিয়ে স্থলভিত্তিক সোলারের চেয়ে এই ভাসমান সোলার স্থাপনের ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, খালের স্রোত, বর্ষাকালে পানি বৃদ্ধি, জলজ আগাছা ও ময়লা আর্বজনার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে এবং যথাযথ নিরাপত্তার অভাবে উপকরণ চুরির আশঙ্কাও রয়েছে।
আবার মৌসুমি বন্যায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহ বা স্রোতে ভাসমান কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুতরাং সে অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন ও গ্রিডের আধুকায়ন অপরিহার্য।
যদিও এসব চ্যলেঞ্জকে খুব বড় করে দেখছেন না প্রকৌশলী ফরিদ খান পাঠান। তিনি বলছেন, যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবেই। তবে প্রাথমিক ব্যয় কিংবা গ্রিডের আধুনিকায়ন ও সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণের খরচের জন্য বাজেট কোনো সমস্যা হবে না। কারণ এসব পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিশ্বব্যংকের তহবিল বরাদ্দ থাকে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির র্শীষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি বিগত সময়ে সরকারে থাকার সময় বিদ্যুতের কারণে জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়েছিলো। এখন আবার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিএনপির সামনে অন্যতম চ্যলেঞ্জ দেশের বিদ্যুৎখাত। আদানীর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা আর দীর্ঘদিন বসিয়ে বসিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার ফলে এখাতের করুণ দশা মোটামুটি অনেকেরই জানা। খোদ বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী জনগণের প্রতি লোডশেডিং সহ্য করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, বিপুল বকেয়া ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় খাল কাটা কর্মসুচির সাথে সমন্বয় করে সোলার স্থাপনের ধারণটি কাজে লাগাত পারলে বিদ্যুৎখাতের চ্যালেঞ্জ হয়তো অনেকাংশেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে আমরা কি আমদানি-নির্ভর জ্বালানি কাঠামোর চক্রে ঘুরপাক খাব, নাকি নিজেদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ সার্বভৌম বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাব? আমাদের সূর্য আছে, খাল আছে। এখন নীতিগত সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। আর গেল ৫ মার্চ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ জানান, ঈদের আগেই হবে এই ঐতিহাসিক কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।