ঢাকা, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

যোগ্য ও স্বচ্ছ প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬ ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৭ বার


যোগ্য ও স্বচ্ছ প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা

রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শ্যামপুর ও কদমতলী থানার অন্তর্গত ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা–৪ সংসদীয় আসন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন।

এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত তানভীর আহমেদ রবিন, জামায়াতে ইসলামীর সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ মো. মোসাদ্দেক বিল্লাহ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সাহেল আহম্মেদ সোহেল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মো. জাকির হোসেন এবং জনতার দলের প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ।

 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর ঢাকা–৪ সংসদীয় আসনে শুরু হয়েছে জোর নির্বাচনী তৎপরতা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা, পথসভা ও উঠান বৈঠকে সরগরম পুরো এলাকা। প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারা তুলনামূলকভাবে একটি ভিন্ন পরিবেশে নির্বাচন দেখছেন।

অতীতে নির্বাচনী আমেজ ও উৎসবমুখর পরিবেশের অভাব ছিল বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে হিসেব-নিকাশও।

 

অনেক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু প্রতীক নয়; যোগ্যতা ও কাজের সক্ষমতা বিবেচনায় ভোট দেওয়ার প্রবণতা এবার বেশি। দীর্ঘ সময় পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলেও ভোটাররা প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা দেখতে চান।

 

কদমতলী থানার ভোটার, তরুণ জুলাইযোদ্ধা ও পেশাদার অনুবাদক মো. রাকিবুল ইসলাম শায়েক বলেন, আমি এবার প্রথমবারের ভোটার। অতীতে ভোট দিইনি, তবে এবার ভোট দেওয়ার বিষয়ে আমরা তরুণরা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা প্রতীক, প্রচারণা বা মিষ্টি প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নয়; যোগ্যতা, সততা ও কাজের সক্ষমতার ভিত্তিতে ভোট দেব। যারা দেশের জন্য, জনগণের জন্য বাস্তব কাজ করবে এবং দেওয়া কথা রাখবে, কেবল তাদেরই আমরা সমর্থন করব। আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি।

৭১’র চেতনা, জুলাইয়ের আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আদর্শের পক্ষে যারা দাঁড়াবে, তাদের সংসদে দেখতে চাই। কোনো মার্কা দেখে নয়, কোনো প্রার্থীর প্রচারে মুগ্ধ হয়ে নয় নিজস্ব বিবেচনায় যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়াই আমাদের মতো তরুণদের সংকল্প। আমাদের লক্ষ্য এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করা, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সক্ষম। 

 

৫২ নম্বর ওয়ার্ডের বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটার আবদুল গনি শেখ (৭৯) বলেন, স্বাধীনতার পর অনেক নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। আসলে সবার মুখোশ একই রকম। নির্বাচনের আগে এক রূপ, পরে আরেক রূপ। কেউই কথা রাখে না। ছাত্ররা আন্দোলন করলো, জীবন দিলো। তারা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তা আদৌ হবে কি না জানি না। তবে আমি চাই এমন এক সরকার ও এমন প্রতিনিধি, যারা নিজের জন্য নয়—দেশের জন্য কাজ করবে। যোগ্য ও স্বচ্ছ মানুষ চাই।

৬০ নম্বর ওয়ার্ডের তরুণ ভোটার আহসান হাবীব সবুজ বলেন, শুরুতে আমাদের মধ্যে কিছুটা সংশয় ছিল আদৌ নির্বাচন হবে কি না। তবে প্রতীক বরাদ্দের পর এখন স্পষ্ট যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সরকারের কাছে জোরালোভাবে আবেদন জানাই, নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, যাতে আমরা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারি।

তিনি বলেন, ঢাকা–৪ আসনের ভোটার হিসেবে আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য চাই, যিনি এলাকার মানুষকে চেনেন, সমস্যাগুলো বোঝেন এবং বাস্তবভাবে কাজ করবেন। শুধু প্রতীক নয়, প্রার্থী হিসেবে মানুষটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে এই এলাকায় যে উন্নয়নের সূচনা হয়েছে, তা আজও মানুষ স্মরণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি ও ধানের শীষ আমাদের পছন্দের প্রতীক। ছাড়াও ধানের শীষের প্রার্থী রবিন একজন পরিচিত মুখ। তার বাবা এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে থেকে কাজ করেছেন। সেই সূত্রে রবিনও এলাকার ঘরের ছেলে। তিনি নিয়মিত এলাকায় আসেন, মানুষের সুখ–দুঃখে পাশে থাকেন। তাই এলাকার মানুষ বিশ্বাস করে, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। অন্যান্য প্রতীকের প্রার্থীদের সম্পর্কে আমাদের পরিচিতি খুবই সীমিত। অনেকেই তাদের চেনেন না। তুলনামূলকভাবে রবিন এলাকায় বেশি পরিচিত, বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য।

৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শরিফউদ্দিন বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ভোট দিতে চাই। কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ ও নিরাপত্তা দরকার। এই এলাকার বড় সমস্যা মাদক। প্রশাসনের চোখের সামনেই মাদককারবারীরা ব্যবসা করছে। গ্যাস-পানি ও নাগরিক সেবার ঘাটতিও দীর্ঘদিনের; কিন্তু দেখার কেউ নাই। যিনি সংসদ সদস্য হবেন, তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করি। একটি মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা চাই।

কদমতলী থানার জুরাইন এলাকার ব্যবসায়ী কামাল মিয়া (৪০) বলেন, ঢাকা–৪ আসন বাংলাদেশের প্রাচীনতম ব্যবসায়িক জোন। তাই যে প্রতিনিধি ব্যবসাবান্ধব হবে এবং চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সৎভাবে কাজ করবে তাকেই আমরা এমপি হিসেবে চাই। নির্বাচনের সময় এলে সবাই অনেক কথা বলে। কিন্তু নির্বাচনের পরে কেউ খোঁজ নেয় না। এবার আমরা এমন লোক চাই, যে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করবে, দখলবাজ, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

৬১ নম্বর ওয়ার্ডের পাটেরবাগ এলাকার স্থানীয়  মুদি দোকানদার খায়রুলের (৩৭) ভাষ্য, নির্বাচন বলতে যা বুঝতাম তা এখন আর তা নেই, সেই আমেজ ও নেই। কয়েকটি দলকেই তো ভোট দিলাম। যেই লাউ সেই কদু। আমার মনে হয় নতুন কোনো দলকে বাছই করা উচিত। এই এলাকায় রাস্তা-ঘাট, ড্রেনেজ, গ্যাস-পানির সমস্যা বছরের পর বছর একই জায়গায় আছে। শুধু উন্নয়নের কথা শুনে শুনে আর বিশ্বাস হয় না।

শ্যামপুরের ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার ও রিকশা গ্যারেজের মালিক মাইনুদ্দিন জমাদার (৪৮) বলেন, আমি ও আমার পরিবার আর মার্কা দেখে ভোট দিতে চাই না। যে মানুষটা কাজ করবে, দুর্নীতির সঙ্গে জড়াবে না তাকেই ভোট দেব।

৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার গৃহিণী শাম্মী আখতার বলেন, রাতে চলাফেরা করতে ভয় লাগে। নিরাপত্তা নেই। যারা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, তাদেরই ভোট দেব।

৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের শিক্ষার্থী আসমা বলেন, আমরা জুলাই আন্দোলন করেছি, দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছি। নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখতে চাই না। ন্যায়পরায়ণ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব চাই। নির্বাচন কমিশনারকেও নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছ ভোট গণনা নিশ্চিত করতে হবে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট, ঢাকা–৪ আসনের মানুষ এবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবসম্মত ও কাজ করার সক্ষমতা আছে এমন প্রার্থী খুঁজছেন। উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা এবং মাদক ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশই এবার ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।

ঢাকা–৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন বাংলানিউজকে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় এলাকায় মানুষের দ্বারপ্রান্তে গিয়েছি। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষের সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। এর মধ্যে ২০টি অঙ্গীকার ঘোষণা করেছি যা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, আমার দায়বদ্ধতাও। কারণ আমি এ এলাকার সন্তান, এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে। আমার বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ অতীতে একাধিকবার এই এলাকা থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং এলাকার উন্নয়নের সূচনা করেছিলেন। আমাকেও ২৪ ঘণ্টাই এই এলাকার মানুষের মধ্যেই থাকতে হবে, তাই মানুষের প্রতি আমি দায়বদ্ধ। 

একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বাংলানিউজকে বলেন, আমি প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়াতে চাই না। নির্বাচিত হলে জনগণের পাশে থেকে এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করব। মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। বিশেষ করে রাস্তা-ঘাটে মা ও বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি সভ্য সমাজ গঠনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের বিকল্প নেই।

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে তুলনা করলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। পরিকল্পিত উন্নয়ন, মৌলিক সেবা নিশ্চিতকরণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনই পারে এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে। আমার এলাকার জনগণের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস করি, ভোটাররা নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। যাদের মাধ্যমে বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব, জনগণ তাদেরই নির্বাচিত করবে বলে আমি আশাবাদী।

সব মিলিয়ে, ঢাকা–৪’র ভোটাররা শুধু প্রতীক বা আবেগের ওপর ভর করে ভোট দিতে চান না। দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে মানুষ বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা, সততা ও কাজের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।  তারা এমন একজন প্রতিনিধিই চান, যিনি এলাকার সমস্যা বোঝেন, কথা নয় কাজে বিশ্বাসী এবং নির্বাচনের পরও মানুষের পাশে থাকবেন।


   আরও সংবাদ