ঢাকা, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীরা খুশি, বেসরকারি খাতের কী হবে!

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪ বার


নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীরা খুশি, বেসরকারি খাতের কী হবে!

ঢাকা: নবম পে-স্কেল অনুমোদনের ঘোষণার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মিল রেখে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন স্কেল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোয় সন্তুষ্ট তারা।

এতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বিভিন্ন পদের মধ্যে থাকা বেতনবৈষম্য দূর করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বেসরকারি খাতের কী হবে-সেই প্রশ্ন উঠেছে।

 

সরকার বলছে-সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা তো একটা খুবই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত এবং সরকার একটা সাহসী সিদ্ধান্তই নিয়েছেন-আমি বলব, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

সরকারি কর্মচারীদের অনেক দিন ধরেই তো আমরা জানি যে, তাদের পে-স্কেল ১১ বছর আগে হয়েছিল। এর মধ্যে আমাদের ডাবল-ডিজিট মূল্যস্ফীতি ছিল এবং তাদের বেতন যেটা বাড়ে, সেটা থেকে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘সুতরাং সেইসব বিবেচনায় এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তই হয়েছে। তবে একই সঙ্গে আমরা এটাও আশা করব যে, সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ-এগুলো সবকিছুর সঙ্গেই সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জড়িত। তো সেখানে আমরা সমান্তরালভাবে আশা করব যে, সেবা প্রাপ্তি, প্রাতিষ্ঠানিক যে ধরনের সহায়তা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেওয়ার কথা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করা-এগুলো আমরা আশা করব যে, সমান্তরালভাবে তারা সেটা নিশ্চিত করবেন।’

‘তাহলে এটা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাঙা করে সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি-এগুলোতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এটা অবশ্যই আমি মনে করি যে, এটা একটা ভালো সিদ্ধান্তই হয়েছে এবং যেভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটা সরকারের সক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই করার চেষ্টা করা হয়েছে,’ বলেন তিনি।

নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।

বেতন স্কেলের আর্থিক প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার একযোগে পুরো বেতন স্কেল বাস্তবায়ন না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতাগুলো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত করা সম্ভব হবে।

বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে-স্কেল পেলেও বেসরকারি শ্রমিকরা এখন নতুন করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বেন। তাই দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে নতুন মজুরি ঘোষণা করা হোক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, ‘নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কেননা, দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, সেখানে মানুষের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্য এটা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অত্যন্ত ক্ষোভ এবং উদ্বেগের সঙ্গে বলছি যে, দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা ‘শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’ আইন করে যাতে ন্যূনতম মজুরি কমিশন গঠন এবং যাতে ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছি; যা অতীতে সরকারও করেনি, বর্তমান সরকারও সেটি করছে না।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান আইন অনুসারে ৩ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার কথা। গার্মেন্টস সেক্টরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছিল। সেই অনুসারে চলতি বছর ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে মজুরি বৃদ্ধি হওয়ার কথা এবং ৬ মাস আগে মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত মজুরি বোর্ড গঠন করেনি।’

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘শ্রম আইনে পরিষ্কার করে বলা আছে, সরকারের নিকট মালিক অথবা শ্রমিক-যেই পক্ষ অথবা উভয় পক্ষ লিখিতভাবে যদি আবেদন করে, তখন সরকার আলোচনা করবেন এবং মজুরি বোর্ড গঠন করবেন। একদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩৯ ধারার উপধারা ৬ অনুসারে ৩ বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার কথা, সে উদ্যোগ সরকারের নিজের নেওয়ার কথা, নেয়নি।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা গার্মেন্টস সেক্টরের যে কয়েকটি জোট আছে—অর্থাৎ ‘গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল’, ‘এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স’, ‘বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’, ‘বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক পরিষদ’সহ ‘গার্মেন্টস ও শিল্প রক্ষা জাতীয় মঞ্চ’-সবগুলো জোট, এমনকি ইন্ডিভিজুয়ালি আমাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’, আমরা সবাই লিখিতভাবে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি অনতিবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করার জন্য। কিন্তু সেই মজুরি বোর্ড গঠন করার উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেনি।’

শ্রমিক নেতা কাজী রুহুল আমিন বলেন, ‘মালিকরা এখানে অতীতের মতোই দায়িত্বহীন আচরণ করছেন, তারা নানা ধরনের অপপ্রচার করছেন। তাদের একটি কথা যে-গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানির সংকট। এটা ঠিক যে, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির সংকট আছে; তার দায় শ্রমিকদের নয়। কেননা, অতীতের সরকার, বর্তমান সরকার এবং অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারগুলো যখন ক্ষমতায় ছিল, তারা সবাই সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে যে জ্বালানি নীতি করেছে, সেই জ্বালানি নীতির কারণেই আমাদের এই গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানির সংকট হয়েছে।’

‘এই গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানির সংকটের আমরা সমাধান চাই। কিন্তু তার অজুহাতে মজুরি বৃদ্ধি না করে আমাদের শ্রমিকদের না খাইয়ে মারবে, আমরা তা সহ্য করব না।’


বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম, গতবার বাজেটে শ্রমিকদের জন্য ১০টা টাকাও বরাদ্দ করেনি, কিন্তু মালিকদের ৬,০০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দিচ্ছে। এইভাবে শ্রমিক মেরে মালিক পোষার নীতি আমাদের শ্রমিক, শিল্প, অর্থনীতি, উৎপাদন এবং সমাজের জন্য কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। সুতরাং, এই পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা এবং যেসব সেক্টরে ৩ বছরের অধিক সময় যাবৎ মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি বা কখনোই মোটেও মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি—সেই সকল সেক্টরে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি।’

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এটার কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ও বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ফজলুল হক।

তিনি বলেন, ‘পে-স্কেলের অনুমোদন হলেও এখনই পুরো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। ফলে এটা বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

 

 

খাতের অর্থনৈতিক মন্দা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাছাড়া বেসরকারি খাত খুব নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় কারখানা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। রপ্তানি বাজারে সংকট, দেশে জ্বালানির সমস্যার কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বেতন বৃদ্ধি তো দূরের কথা, কলকারখানা চালু রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া বেসরকারি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ এখনো ৩ বছর হয়নি। এর মধ্যে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ (ইনক্রিমেন্ট) করে বেতন বাড়ছে। ফলে পে-স্কেল অনুমোদন হলেই বেসরকারি খাতে এর প্রভাব পড়বে না’। 

একই সঙ্গে তিনি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করেন।

নতুন বেতন স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।

তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় ফজলুল হক বাংলানিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাতের কর্মকর্তারা বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাদের এই দাবি যৌক্তিক ছিল। অবশেষে সরকার সার্বিক দিক বিবেচনা করে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা দেখছেন না এই ব্যবসায়ী নেতা।

এ বিষয়ে ফজলুল হক স্পষ্ট করে বলেন, ‘পে-স্কেল অনুমোদন পেলেই তা একযোগে বা রাতারাতি পুরোটা কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। ফলে বাজারে এর কোনো নেতিবাচক বা হঠাৎ চাপ পড়ার সুযোগ নেই।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এই বেতন বৃদ্ধি জরুরি ছিল। তবে তা যেন সুশৃঙ্খলভাবে এবং অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি রাখা উচিত।’


   আরও সংবাদ