ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৮ বার
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৬ জুলাই একটি ঐতিহাসিক দিন। কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল, ১৬ জুলাই তা পূর্ণতা পায়।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে। এ দিনটি ছিল ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের বুলেটে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত সেই ছবিটি ছড়িয়ে পড়লে মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে। আন্দোলন হয়ে ওঠে সর্বব্যাপী।
সেই সঙ্গে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড হয়ে ওঠে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম ‘রূপান্তরকারী’ ঘটনা। একটি বুলেট যখন বন্দুকের নল থেকে বের হয়, সেটার ওপর কারও নাম লেখা থাকে না।
কিন্তু যখন সেটা একজন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রের বুক ভেদ করে, সেই বুলেটই লিখে ফেলে ইতিহাস। ১৬ জুলাই তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। আবু সাঈদের রক্ত সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে। এই ইস্পাত-কঠিন ঐক্য বাংলাদেশকে নিয়ে যায় মুক্তির পথে। এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের মাধ্যমে পতন হয় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। সরকার ১৬ জুলাইকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে। এ উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। ১৬ জুলাই কেবল শহীদ দিবস নয়, বাংলাদেশের জনগণের অভূতপূর্ব ঐক্য আর সংহতির প্রতীক। বাংলাদেশের জনগণ যে ঐক্যবদ্ধ হলে সবকিছু জয় করতে পারে, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান তার প্রমাণ। আর এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিনটি হলো ১৬ জুলাই। এই দিনটি আমাদের ঐক্যের।
১৬ জুলাই বাংলাদেশের আপামর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বলেই বিজয় এসেছিল। জনগণ কি কেবল কোটা সংস্কারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল? অবশ্যই না। এ দেশের আপামর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল মানবাধিকারের জন্য, ভোটের অধিকারের জন্য। শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। নারীরা চেয়েছিলেন সমতা এবং অধিকার। ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন ব্যবসার পরিবেশ। সবাই মিলে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই এ ১৬ জুলাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তাই ১৬ জুলাই জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ২৪-এর জুলাই বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যের স্মারক। কিন্তু আজ দুই বছর পর আমরা কি সেই ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছি? যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, বাংলাদেশ কি সেই প্রত্যাশার পথে হাঁটছে? জুলাই বিপ্লব কি বাংলাদেশের জনগণকে বৈষম্য থেকে মুক্তি দিয়েছে? যে স্বপ্ন দিয়ে শিক্ষার্থী এবং মা-বোনেরা রাজপথে নেমেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের পথে কি বাংলাদেশ হাঁটছে?
এই প্রশ্নের উত্তরে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই হতাশার কথা বলবেন। তারা বলবেন, জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, জুলাই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, দুই বছর পরও সেই আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, ২৪-এর জুলাইয়ে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আবারও বিভাজন আর বিভক্তি সবখানে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন বহুধা বিভক্ত। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেয়নি বিরোধী দল। রাজনৈতিক এই বিভাজনের প্রভাব পড়েছে সবখানে।
অর্থনীতির মেরুদণ্ড বেসরকারি খাতকে বিভক্ত করা হয়েছে। কে দোসর, কে অতীতে কী করেছে, সেই হিসাব-নিকাশ করতে করতেই বেসরকারি খাতকে আমার লোক, তোমার লোকে ভাগ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিভক্ত। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের অলৌকিক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেকেই এখন গাড়ি, বাড়ি এবং বিপুল সম্পদের মালিক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, কোটার সংস্কার হয়নি। সরকারি চাকরিতে এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই বৈষম্য। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়নি। আইনের শাসনের বদলে শুরু হয়েছে মবের শাসন। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জুলাইয়ের ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি বলেই সবখানে আশাভঙ্গের বেদনা।
প্রশ্ন হলো, কেন আমরা ঐক্য ধরে রাখতে পারলাম না? কেন সেই অভূতপূর্ব ঐক্যের বিপরীতে আজ আবারও বিভক্তি আর প্রতিহিংসার অসহিষ্ণুতা?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দুই বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ২৪-এর ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে। প্যারিস থেকে ২৪-এর ৮ আগস্ট দেশে ফিরে তিনি প্রথমে ঐক্যের গান গেয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ এক পরিবার। সবাই মিলে দেশ গড়ার কথাও বলেছিলেন ড. ইউনূস। কিন্তু ১৮ মাসের শাসনকালে ইউনূস প্রমাণ করেছেন, তিনি যা বলেন, তা করেন না। তিনি যা বলেন, তা বিশ্বাস করেন না। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ঐক্যের বাংলাদেশকে বিভক্ত করার জন্য একমাত্র দায়ী ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টারা। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেড় বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়।
এই সময় দেশ অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
ইউনূস সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে অর্থনীতি ধ্বংসের আয়োজন করেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মববাহিনী শিল্পকারখানায় নির্বিচারে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। সরকার দূর থেকে তামাশা দেখতে থাকে। শিল্পকারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ইউনূস শাসনামলে।
বেসরকারি উদ্যোক্তারা হতাশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাই নিরাপদ মনে করেন। বন্ধ হয়ে যায় বহু কারখানা, নতুন করে বেকার হন দেড় কোটি মানুষ। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় আরও ২ কোটি মানুষ। ১৮ মাসে ড. ইউনূস দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে ফেলেছেন। দেড় কোটি বেকার আর ২ কোটি চরম দরিদ্র মানুষ সৃষ্টি করেছেন। বিনিয়োগ বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, অর্থনীতি অচল। ১৮ মাসে দেশের শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছেন, দেশের শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। কথায় কথায় মারামারি, ক্লাস বন্ধ, অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করেছে।
ইউনূস আমলে গণমাধ্যমে এক আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। মবের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে বহু সাংবাদিককে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছিল হতাশার চিত্র। রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে খেলাধুলা মুক্ত রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের দরজা বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইউনূসের আমলে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল মব সন্ত্রাস। মবের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। ইউনূসের আমলে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলেছেন, ঘুষের রেট বেড়েছে। হাতেগোনা দু-একজন উপদেষ্টা ছাড়া সবার বিরুদ্ধেই উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। এভাবেই ড. ইউনূস বাংলাদেশকে করেছেন ক্ষতবিক্ষত এবং বিভক্ত।
তবে, ইউনূস সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিকল্পিত বিভাজন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং একমাত্র কাজ ছিল, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু তা না করে ক্ষমতা দখল করে রাখার জন্য সংস্কার নাটক তৈরি করেন। রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বিদেশ থেকে ভাড়াটে লোক এনে একদিকে যেমন কালক্ষেপণ করেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করান। সংবিধান সংস্কারের নামে উদ্ভট এবং অযৌক্তিক কিছু বিষয় এনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। সংবিধান কতটা, কীভাবে সংশোধন হবে, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র প্ল্যাটফর্ম হলো জাতীয় সংসদ। কিন্তু সংবিধান সংস্কারের নামে মাসের পর মাস অপ্রাসঙ্গিক বিষয় এনে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন ড. ইউনূস।
সেই পুরোনো ডিভাইড অ্যান্ড রুল পদ্ধতির মাধ্যমে ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে শেষ পর্যন্ত ইউনূসের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলেও জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি ঠিক ঢুকিয়ে দিয়েছেন অবিশ্বাসের বীজ। যে কারণে, আজ জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজনীতির আকাশে আবারও কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। তবে, আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই জুলাই চেতনাকে ধারণ করেছেন। এজন্যই তিনি বারবার ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কারণ, তিনি জানেন, এই ঐক্যই আসলে বাংলাদেশের মূল শক্তি। জুলাই এই ঐক্যের প্রতীক। ১৬ জুলাই বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। দুই বছরে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এ ঐক্য আজ বিপন্ন। এ ঐক্য নষ্ট হলে জুলাই আন্দোলনের চেতনা নষ্ট হবে। বাংলাদেশে আবার সেই বিভক্তির চোরাস্রোত আটকে যাবে। তাই এ জুলাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল হতে হবে। সমঝোতা আর ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে।