ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ জুন, ২০২৬ ২০:২৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৮ বার
ঢাকা: ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষ। স্বজনদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে নেত্রকোনা থেকে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরেছেন নাসিমা বেগম।
কোনো ভোগান্তি ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে পৌঁছালেও বিপাকে পড়েন মহাখালী বাস টার্মিনালে নেমেই। তার বাসা যাত্রাবাড়ী।
মহাখালী থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে সাধারণত সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে ভাড়া দিয়ে থাকেন তিনি। কিন্তু সোমবার (১ জুন) কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশা তার কাছে ভাড়া হেঁকেছে ৫০০ টাকা।
নাসিমা বুঝতে পারেন, তার কাছে বাড়ি থেকে ফেরার ব্যাগ-ব্যাগেজ দেখেই এত অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হয়েছে। অনেক দরকষাকষি করলেও নাসিমা দেখেন, সব অটোরিকশা চালকেরই ভাড়ার রেঞ্জ কাছাকাছি।
অগত্যা উপায় না পেয়ে একটি বাসে উঠেই বাসার পথ ধরেন তিনি।
শুধু নাসিমাই নন, ঈদ উদযাপন শেষে ঢাকায় ফেরা অনেক যাত্রীর অভিযোগ, রাজধানীতে ফিরেই সিএনজিচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে তেমন কোনো ভোগান্তি না থাকলেও বাস টার্মিনালে নেমে নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু সিএনজিচালক যাত্রীদের ঘিরে ধরছেন এবং মালামাল টানাটানি করে যাত্রী নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। যেসব গন্তব্যে সাধারণত ২০০ টাকা ভাড়া, সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন অনেক চালক। ভাড়া নিয়ে এমন অনিয়ম ও হয়রানিতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীরা।
রব রব পরিবহনের বাসে ওঠার আগে নেত্রকোনাফেরত নাসিমা বেগম বাংলানিউজকে বলছিলেন, ‘পথে তেমন কোনো যানজটে পড়তে হয়নি, অতিরিক্ত ভাড়াও দিতে হয়নি। তবে ঢাকায় নেমে ভিন্ন ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, মহাখালীতে নামার পর অনেক সিএনজি দেখতে পেলেও যাত্রাবাড়ী যেতে যেখানে সাধারণত ৩০০ টাকা ভাড়া, সেখানে এখন ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একসঙ্গে পাঁচ-ছয়জন সিএনজিচালক এসে জিজ্ঞাসা করেন, কোথায় যাবেন? অনেক সময় ব্যাগও ধরে টানাটানি করেন। আমাদের মতো নারী যাত্রীদের সঙ্গে যদি এ ধরনের আচরণ করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।’
তার অভিযোগ, সব সিএনজি চালকরা সিন্ডিকেট করে ভাড়া একশ, দুইশ, তিনশ টাকা বেশি না হলে কেউই যেতে চাচ্ছেন না।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান কাফরুলের বাসিন্দা জুয়াইরিয়া খাতুন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “আমি ঈদের পরের দিন গাবতলী যাওয়ার জন্য একটি সিএনজি ভাড়া করতে চাইলে চালক প্রথমে ৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। অথচ স্বাভাবিক সময়ে একই পথে ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যেই দিয়ে থাকি। এত বেশি ভাড়া কেন জানতে চাইলে চালক বলেন, ‘ঈদের বাজার, ১০০-২০০ টাকা বেশি না নিলে যাব না’। আমি তখন প্রশ্ন করি, ‘ঈদ এলেই কি ২০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে?’ এর জবাবে চালক জানান, ৪০০ টাকার নিচে তিনি যাবেন না। কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৪০০ টাকা ভাড়া দিয়েই আমাকে গাবতলী যেতে হয়েছিল।”
জুয়াইরিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যদি রাজধানীতে চলাচলের জন্য এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে ঢাকা শহরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করবে?’ আমি মিটারে যেতে চাইলে চালক আমাকে বলেন, ‘গাড়িতে মিটার আছে কিন্তু নষ্ট’।”
যাত্রীদের অভিযোগ, এই ধরনের কিছু অসাধু চালকের দৌরাত্ম্য শুধু মহাখালী-গাবতলী বাস টার্মিনালেই সীমাবদ্ধ নয়, রাজধানীর প্রায় সব বড় বাস টার্মিনালেই একই চিত্র দেখা যায়। নিজেরা সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে অনেক চালক নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০, ২৫০ এমনকি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া দাবি করেন।
অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রী নিতে অনীহা প্রকাশ করেন তারা। ফলে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
‘ঈদের সময় একটু বেশি ভাড়া বা বকশিস পাওয়ার আশা থাকে’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাংলানিউজকে বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে সব বাস টার্মিনালেই যাত্রীর চাপ সবচেয়ে বেশি। ঈদের সময় একটু বেশি ভাড়া বা বকশিস পাওয়ার আশা থাকে।’

যানজট সৃষ্টি ও যাত্রীদের ব্যাগ টানাটানির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা বেশি হলে অনেক চালক যাত্রীর কাছে ভিড় করেন। কেউ কেউ ব্যাগ ধরাধরি বা টানাটানি করতে পারেন, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন কাজ করি না। কেউ করলে তার বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’
মিটারের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু মিটারে চললে অনেক সময় জমা ওঠে না। অনেক মিটারের অবস্থাও ভালো নয়। তবে আমরা সব সময় চুক্তিতে যাই না, কখনো মিটারে আবার কখনো চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করি।’
‘২০০ টাকার ভাড়া ১০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়’
যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, দক্ষিণাঞ্চল থেকে ভোরবেলায় সদরঘাটে পৌঁছানো যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন। সদরঘাটে নামার পর সিএনজিতে ১০০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, ২০০ টাকার ভাড়া ১,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি বা বনানীর মতো এলাকায় যেতে চাইলে এক হাজার টাকার নিচে ভাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, অনেক যাত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর প্রতিকার পান না। কারণ ঘাটকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতা কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, সরকার চাইলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। পাঠাও বা উবারের মতো অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থার আদলে সরকারি তত্ত্বাবধানে একটি ডিজিটাল ভাড়া ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে নগদ অর্থ লেনদেন কমবে এবং যাত্রী ভোগান্তিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত মামলা করছে, বিআরটিএ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে, কিন্তু সিএনজি মালিক, তাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কিংবা চালকদের কার্যকর জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। আর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সড়ক পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
অভিযোগ বা প্রমাণ পেলেই পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে
এ বিষয়ে মহাখালী জোনের ট্রাফিক পুলিশের টিআই ওমর ফারুক বাংলানিউজকে বলেন, ঈদের ছুটি শেষে বিপুল সংখ্যক যাত্রী ঢাকায় ফিরছেন। কোনো চালক অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করলে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করলে বা যাত্রীদের হয়রানি করলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ওমর ফারুক আরও বলেন, আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পেলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় কোনোভাবেই যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
জানতে চাইলে ট্রাফিক গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. জিয়াউর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, ভাড়া নিয়ে অনেক সিএনজি চালক যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও ঝামেলায় জড়াচ্ছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আমরা একাধিক মামলা করেছি। তবে এই মুহূর্তে সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে, নিয়মিত যানবাহন তল্লাশি ও চেকিং করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক চালক মিটারে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন, এমন অভিযোগ বা প্রমাণ পেলেই আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।