ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ মে, ২০২৬ ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার
ঢাকা: গত ১৯ মে সকালে রাজধানীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ফাস্ট গার্ল রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। প্লে থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ওই স্কুলেই পড়ালেখা করেছিল সে।
মেয়ের স্কুলে যাওয়ার সুবিধার কথা ভেবে রামিসার বাবা-মা স্কুলের পাশের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেছিলেন। ছোটবেলা থেকে বাবা-মা ও খেলার সাথীদের সঙ্গে সেখানেই বেড়ে উঠছিল রামিসা।
শুক্রবার (২২ মে) দুপুরের পর ওই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, রামিসা যে বাসায় বেড়ে উঠছিল, সেখানে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। পাঁচতলা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে গিয়ে দেখা যায়, রামিসার বাসা তালাবন্ধ।
ভবনের চারতলায় ভাড়া থাকেন রামিসার বাবার বন্ধু সালাউদ্দিন। সিঁড়ি বেয়ে বাসায় ঢোকার সময় তিনি বাংলানিউজকে বলেন, রামিসাকে হারিয়ে তার বাবা-মা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
তারা আমার বাসায় আছেন, কিন্তু মিডিয়ায় কথা বলতে চাচ্ছেন না। অন্য সময় আসুন।
রামিসাদের পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী আঁখি পরিবার নিয়ে সাবলেট থাকেন। তিনি জানান, হত্যাকারী সোহেল রানার স্ত্রীর নাম স্বপ্না। মাঝে মাঝে স্বপ্না তাদের ফ্ল্যাটের ফ্রিজে মাছ রাখতে আসতেন এবং বলতেন তার স্বামী তাকে নির্যাতন করেন। স্বপ্না ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে ফ্রিজে মাছ রাখার প্রয়োজনে যাতায়াত করতেন।
রামিসার হত্যাকারী সোহেল রানাকে ঢাকায় চাকরি ও বাসার ব্যবস্থা করে দেন ওই ভবনের ভাড়াটিয়া সাদ্দাম। সাদ্দামের স্ত্রী সীমা পটুয়াখালীর মেয়ে হলেও
তার শ্বশুরবাড়ি নাটোর জেলার সিংড়া থানার মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে। তবে গত ১৫ বছর ধরে তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন। রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হলেও গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ মাঝে মাঝে হতো।
সীমা জানান, শ্বশুরবাড়ির সুবাদে সোহেল দম্পতির সঙ্গে তার স্বামীর পরিচয় ছিল। আর্থিক সংকটে পড়ে কয়েক মাস আগে সোহেল ও তার স্ত্রী ঢাকায় আসেন। গত বর্ষায় মাছ ধরার জন্য সোহেল বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু সময় মতো সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় পাওনাদারদের চাপে পড়েন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তিনি পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হন।
সীমা আরও জানান, ঢাকায় আসার পর সোহেলদের সহযোগিতা করার জন্য তার স্বামীর পরিচিত সোহেলের এলাকার কামাল (যাকে তারা কাকা ডাকেন) ফোনকলে অনুরোধ জানান। মানবিক বিবেচনায় সীমার স্বামী গ্যারেজ মালিক মনিরের সঙ্গে কথা বলে সোহেলকে মিস্ত্রির কাজের ব্যবস্থা করে দেন।
গত রমজান মাস থেকে সোহেল ও তার স্ত্রী ওই ভবনের তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে ওঠেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক।
স্থানীয়রা জানান, সোহেল দিনের বেশিরভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকলে তার স্ত্রী প্রায়ই সীমাদের বাসায় যেতেন। কখনও ফ্রিজে মাছ রাখতে, কখনও আদা-রসুন বাটতে সহায়তা নিতে। ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল।
সীমা জানান, সোহেলদের গ্রামের বাড়ি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে সড়কপথে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে।
২০০৮ সাল থেকে ঢাকায় বসবাসকারী সাজ্জাদ জানান, সোহেলকে তিনি গ্রামের মানুষ হিসেবে চিনতেন, তবে তাদের মধ্যে খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না। একই এলাকার পরিচিত হওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনি সোহেল ও তার স্ত্রীকে ঢাকায় চাকরি ও বাসা পেতে সহায়তা করেছিলেন।
সাজ্জাদ আরও জানান, ঢাকায় আসার পর এলাকার কামাল কাকা তাদের সহযোগিতা করতে অনুরোধ জানান। এলাকার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সোহেলের থাকা ও কাজের ব্যবস্থা করেন। রহমত ক্যাম্প এলাকায় একটি রুম এবং নিজের বাসার নিচে থাকা মনির ভাইয়ের গ্যারেজে মেকানিকের কাজও পাইয়ে দেন।
শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও কিছুদিন পর থেকেই সমস্যা দেখা দেয়। সোহেল নিয়মিত কাজে যেতেন না এবং কাজে অবহেলা করতেন। এ কারণে গ্যারেজ মালিক মনির ভাই প্রায়ই এসে অভিযোগ করতেন। পরে জানা যায়, সোহেল ইয়াবা আসক্ত। এ তথ্য জানার পর সোহেলের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সাজ্জাদ।
তিনি বাড়িওয়ালাকে বিষয়টি জানিয়ে সোহেলকে সাবলেট বাসা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং গ্যারেজ মালিক মনির ভাইকেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে ভবিষ্যতে সোহেলের কোনো দায়-দায়িত্ব তিনি আর নেবেন না।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২১ মে) রামিসার সহপাঠী রাইসা বাংলানিউজকে বলে, রামিসা টিফিন আনলে আমার সঙ্গে শেয়ার করে খেতো। ক্লাসে মিস যখন আমাকে পড়া ধরতেন এবং আমি ভুলে যেতাম, তখন রামিসা আমাকে পড়া শিখিয়ে দিতো। সে ক্লাসের ফাস্ট গার্ল ছিল।
স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা মালিহা ইসলাম বলেন, রামিসা খুব মেধাবী ও চঞ্চল ছিল। ওর রোল ছিল ১। ক্লাসে যখনই দেখা হতো, সালাম দিয়ে বলতো মিস, আপনাকে সুন্দর লাগছে। সে বলতো মিস, পড়াটা আমাকে বুঝিয়ে দেন। যেহেতু সে ফার্স্ট বেঞ্চে বসতো, তাই তার সঙ্গে বেশি কথা হতো। রামিসার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, এটা আমরা ভাবতেও পারিনি।
তিনি আরও বলেন, খবর পেয়ে রামিসার বাসায় গিয়ে দেখলাম তার সঙ্গে নিপীড়ন ও নির্যাতন করা হয়েছে। হত্যাকারী যেহেতু জবানবন্দি দিয়েছেন, তাই দ্রুত তার বিচার নিশ্চিত করা হোক। রিমান্ডের নামে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রকাশ্যে তার ফাঁসি কার্যকর করা হোক।
কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত প্রথম পার্বিক পরীক্ষায় রামিসা বাংলায় ৯০, ইংরেজিতে ৯৩, গণিতে ৯৫.৫, ধর্মে ৯৫ এবং ড্রয়িংয়ে ৯৬ নম্বর পেয়েছিল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম পরীক্ষার খাতা দেখিয়ে এ তথ্য জানান।
ড্রয়িং পরীক্ষার খাতা দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক সাইফুল বলেন, রামিসার বাবা হান্নান তাকে জানিয়েছেন, মেয়ে ড্রয়িং পরীক্ষায় কাবা শরিফ এঁকে বাবাকে দেখিয়ে বলেছিল, বাবা, আমাকে কিন্তু এখানে নিয়ে যাবে। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, সুযোগ হলে তোমাকে কাবা শরিফ দেখতে নিয়ে যাবো।
গত মঙ্গলবার সকালে মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয়তলায় নিজ বাসার পাশের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানায়, শিশুটিকে প্রথমে যৌন নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুম ও আলামত নষ্ট করার উদ্দেশে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসেন। নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রামিসাকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনে গভীর আক্ষেপে রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেছিলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। কোনো পদক্ষেপ নেবেন? পারবেন না। এটা বড়জোর ১৫ দিন আলোচনায় থাকবে, এরপর আরেকটা বড় ঘটনা ঘটলে সব চাপা পড়ে যাবে।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করলেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার খুব বেশি মেলামেশা ছিল না।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। জবানবন্দিতে তিনি শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করার এবং দ্বিতীয় আসামি স্ত্রী স্বপ্নার সহায়তায় লাশ গুমের উদ্দেশে রামিসার মাথা আলাদা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করার কথা স্বীকার করেন। জবানবন্দি রেকর্ডের পর আদালত সোহেল রানাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রামিসা হত্যার বিচার চেয়ে তার বাসার সামনে বৃহস্পতিবার জড়ো হয়েছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। সবাই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।