ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬ ১৮:০৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার
চট্টগ্রাম: শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ জ্বর, দুর্বলতা, শরীরে অস্বস্তি। পরিবার ভেবেছিল মৌসুমি ভাইরাল জ্বর।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে, সঙ্গে যোগ হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট।
বলছি হাম আক্রান্ত ১৬ বছর বয়সী কিশোরী জান্নাতুলের কথা। যিনি বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে।
স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত জান্নাতুলকে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি মেলেনি।
জান্নাতুলের বড় বোন আয়েশা আক্তার বাংলানিউজকে জানান, সে এমনভাবে শ্বাস নিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল খুব কষ্ট হচ্ছে। কথা বলতেও পারছিল না। তখন আমরা ভয় পেয়ে যাই। শ্বাসকষ্টে ছটফট করা দেখে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে পরে এখানে (জেনারেল হাসপাতালে) ছুটে এসেছি।
আয়েশা আরও বলেন, আমরা তো সবসময় শুনেছি হাম শিশুদের হয়। ফেসবুকেও দেখেছি বাচ্চাদের খবর। কিন্তু হঠাৎ আমার বোনের এমন অবস্থা হবে, এটা কখনো ভাবিনি। ও যখন নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না, মনে হচ্ছিল বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
একসময় যে রোগকে কেবল শিশুদের অসুখ হিসেবে দেখা হতো, সেই হাম এখন বড়দের শরীরেও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে জান্নাতুলের মতো অসংখ্য পরিবার।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা কিশোরীটির মুখে এখনও দুর্বলতার ছাপ। তবু পাশে বসা বোনের চোখে এক ধরনের স্বস্তি। অন্তত এখন সে চিকিৎসার মধ্যে আছে।
জান্নাতুল শুধু একা নন। একই ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন আরও কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী রোগী, যাদের প্রায় সবার গল্পেই মিল আছে। প্রথমে রোগটিকে গুরুত্ব না দেওয়া, পরে হঠাৎ জটিলতা তৈরি হওয়া।
চাক্তাই ফিশারিঘাট এলাকার কুলসুমা বেগম ৬ দিন ধরে চিকিৎসাধীন। তার স্বামী আলী আফসার বাংলানিউজকে জানান, আমরা বুঝতেই পারিনি এটা হাম হতে পারে। বড় মানুষের হাম হয়, এটা মাথাতেই আসেনি। শুরুতে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেইনি। পরে রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে আসি। বর্তমানে ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কুলসুমা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন ।
একই অভিজ্ঞতা অর্পিতা দাসের পরিবারেরও। গত ৬ তারিখ থেকে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অর্পিতার পরিবারও শুরুতে বুঝতে পারেনি তার কী হয়েছে । প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসার পর বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে এটি আসলে হাম ।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত এখানে ৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী হামের চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৫ জন নারী রোগী। একই সময়ে শিশু ওয়ার্ডেও ভর্তি রয়েছে ১৪ জন শিশু।
জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা আলাদা ব্যবস্থা রেখেছে। শিশুদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের পাশাপাশি ১৪ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ ‘ইনফেকশাস ব্লক’। সেখানে বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী রোগীও চিকিৎসাধীন আছেন।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক হয়তো শৈশবে পূর্ণ টিকা নেননি, অথবা সময়ের সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে হামের সংক্রমণ হলে তা জটিল আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বেশি।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বাংলানিউজকে বলেন, আগে বড়দের মধ্যে হাম খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। অনেকে শৈশবে টিকা নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত নন। আবার কারও টিকা অসম্পূর্ণ ছিল। ফলে ভাইরাসটি সুযোগ পেলে সহজেই আক্রমণ করছে।
তিনি জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম বা টিকার সুরক্ষা নেই, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
এ চিকিৎসকের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হাম অনেক সময় শিশুদের চেয়ে জটিল আকার নেয়। উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমি, পাতলা পায়খানা এবং খাবার গ্রহণে অক্ষমতা এসব উপসর্গ নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। অনেকের শরীরে পানিশূন্যতাও দেখা দিচ্ছে।
আরেক চিকিৎসক রায়হান সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, হাম নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে বড়দের ক্ষেত্রে রোগটি নিয়ে ভুল ধারণা বেশি। অনেকেই মনে করেন হাম কেবল শিশুদের হয়, ফলে লক্ষণ দেখা দিলেও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।