ঢাকা, রবিবার, ১০ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

৮ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১০ মে, ২০২৬ ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


৮ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

দুর্বল নীতিসহায়তা এবং সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতিতে রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাক খাতের বর্জ্য রিসাইক্লিং বা পুনর্প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে।

সতর্ক করে তারা বলেন, দ্রুত সংস্কার না করলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চাপে পড়তে পারে।

বিশেষ করে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলো যখন কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড এবং ট্রেসেবিলিটি (উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস জানার প্রক্রিয়া) নিশ্চিতের দিকে এগোচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইনি পরিবর্তন আসছে।

এর ফলে পণ্য কোথা থেকে আসছে তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব সরবরাহ ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়বে।

 

বুধবার (৬ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) যৌথভাবে একটি সেমিনারের আয়োজন করে।

 

‘অ্যাক্সিলারেটিং সার্কুলার ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ’ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি: ইনসাইটস ফ্রম সুইচ টু সিই পাইলটস’ শীর্ষক এই সেমিনারে বক্তারা এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএ এর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, বৈশ্বিক আইনি পরিবর্তনগুলো পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে। এটি এখন টেকসই কমপ্লায়েন্স এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ইইউ-এর গ্রিন ডিল এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) এর মতো উদ্যোগগুলোর জন্য এখন অধিক স্বচ্ছতা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে। এটি নির্মাতাদের পুনর্প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিতে যেতে বাধ্য করবে। এর ফলে রিসাইকেল করা উপকরণের ব্যবহার বাড়বে, নতুন কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সামগ্রিকভাবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে টেক্সটাইল বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে এখন বছরে প্রায় ৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এই বর্জ্যের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহৃত বা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তবে এটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আসেনি।

তিনি উল্লেখ করেন, এই খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনলে দুটি প্রধান সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রথমত, তদারকির অভাবে সৃষ্ট আগুনের মতো স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে এবং দ্বিতীয়ত, একটি সুসংগঠিত ও নিরাপদ শিল্প ভিত্তি তৈরি হবে।

পরিত্যক্ত ফাইবার বা তন্তু এবং টেক্সটাইল বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে পুনরায় ব্যবহারের শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। শতভাগ সুতি বর্জ্য যান্ত্রিকভাবে রিসাইকেল করা সম্ভব হলেও, রাসায়নিকভাবে রিসাইক্লিং করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনো সীমিত।

বর্তমানে রিসাইক্লিং মূলত তুলা-নির্ভর। মিশ্র ফেব্রিক এবং কৃত্রিম তন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে সঠিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এই উপকরণগুলোকে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব।

তিনি সতর্ক করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পদের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের সীমিত সরবরাহের কারণে তুলা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিসাইকেলযোগ্য বিকল্পের দিকে যেতে হবে।

২০২২-২৩ সাল থেকে বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি গড়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে একে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজ চলছে। তবে ব্যাপকভিত্তিক নীতি এবং আইনি কাঠামোর অভাবে এর অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, যদিও কিছু নীতি নির্দেশিকা চালু করা হয়েছে, তবে বর্জ্য ব্যবহারের জন্য একটি স্পষ্ট জাতীয় নীতি এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর অভাব এখনো রয়ে গেছে। বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই এবং রিসাইক্লিং যাচাই করার জন্য বর্তমানে পাইলট প্রকল্প চলছে। তবে বাংলাদেশের টেক্সটাইল বর্জ্যের মাত্র সামান্য একটি অংশ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রিসাইকেল করা হচ্ছে।

একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিএমইএ এর সহ-সভাপতি বিদ্যা অমৃত খান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের সম্পূর্ণ বর্জ্য রিসাইকেল করা সম্ভব হলে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বৃত্তাকার অর্থনীতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ তুলা-ভিত্তিক পোশাকের বর্জ্যের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রিসাইকেল করতে পারে, যার মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার। তবে এই বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারত ও পাকিস্তানে রপ্তানি করা হয় এবং পরবর্তীতে সেগুলো আবার রিসাইকেল করা সুতা হিসেবে আমদানি করা হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৭টি কারখানা পাইলট প্রকল্পের আওতায় কাজ করছে, যার আনুমানিক মূল্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলার।

সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা যাই হোক না কেন, দেশটিকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রিসাইক্লিং ক্ষমতা এবং পরিবেশবান্ধব দক্ষতা বাড়াতে হবে।

 

তিনি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের আহ্বান উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ‘পণ্য নাও-বানাও-ফেলে দাও’ মডেল থেকে সরে এসে পুনব্যবহার এবং স্থায়িত্বের দিকে যেতে হবে। রিসাইক্লিং, বিকল্প উপকরণের ব্যবহার এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের মতো পদ্ধতিগুলো খরচ কমাতে পারে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে।

টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, এর বিশাল পরিধি এবং বর্জ্যের পরিমাণের কারণে এটি অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরে ৫০ লাখ টনের বেশি টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদন করে, যেখানে বাংলাদেশ উৎপাদন করে প্রায় ৬ লাখ টন।

তিনি এলডিসি পরবর্তী সময়ে ইইউ বাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে অগ্রিম পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং মাহমুদ হাসান খানও বক্তব্য রাখেন।


   আরও সংবাদ