ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২০ বার
জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম ফেজ-৩ এর আওতায় প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের পদ্মার চর উচ্চ বিদ্যালয়ে ফ্ল্যাগভিত্তিক বন্যা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাবিষয়ক একটি দিনব্যাপী প্রস্তুতিমূলক মহড়ার আয়োজন করেছে। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে বন্যার আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ, সমন্বয় বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
ফরিদপুর জেলা বাংলাদেশের অন্যতম বন্যাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রায় প্রতি বছর নিম্নাঞ্চল ও বিশেষ করে চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠী বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়। এর ফলে ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং মৌলিক সেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার সময়কাল, গভীরতা ও তীব্রতার অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জাতীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় অগ্রগতি থাকলেও এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত পূর্বাভাসকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য ও ব্যবহারযোগ্য নির্দেশনায় রূপান্তর করা।
অনেক ক্ষেত্রেই নদীর পানির উচ্চতা বা পূর্বাভাসভিত্তিক তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য পরিষ্কারভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে তারা সময়মতো কার্যকর প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হন।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ডাইনামিক ফ্লাড রিস্ক মডেল ফরিদপুরে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই মডেলটি জটিল বন্যা পূর্বাভাসকে পাঁচটি সহজ ঝুঁকি স্তরে রূপান্তর করে, যা ১ থেকে ৫টি পতাকার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নির্দিষ্ট আগাম করণীয় পদক্ষেপ যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণ সহজেই বুঝতে পারে কখন কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে।
দিনব্যাপী এই মহড়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় জনগণ অংশগ্রহণ করেন। বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে বিভিন্ন বন্যা পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণকারীরা তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা অনুশীলন করেন এবং সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম। তিনি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও সহজবোধ্য ও কার্যকর করার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়ে তাদের বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে সহায়তা করছে। তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া জীবন ও সম্পদ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং সংস্থাটি আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে।
এরপর নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের একজন কমিউনিটি প্রতিনিধি বাস্তব বন্যা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সময়মতো ও সহজবোধ্য সতর্কবার্তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কারিগরি সেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের প্রফেসর আনিসুল হক। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ডাইনামিক ফ্লাড রিস্ক মডেল ঝুঁকি তথ্যকে দৃশ্যমান ও ব্যবহারযোগ্য ফ্ল্যাগভিত্তিক সতর্কবার্তায় রূপান্তর করে। তিনি আরও দেখান, কীভাবে প্রতিটি পতাকা স্তরের সঙ্গে পানির গভীরতা, বন্যার সম্ভাব্য সময় এবং ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কিত থাকে এবং এর ভিত্তিতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়। সিমুলেশন ড্রিলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন কর্মী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা অংশগ্রহণ করেন।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান এবং ফরিদপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুল হক। তারা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর আগাম সতর্কতা প্রচারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমের বাস্তবধর্মী অনুশীলনে সিমুলেশন মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, অতীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ত্রাণ বিতরণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের মহড়া আয়োজন বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসকে সহজবোধ্য, ব্যবহারযোগ্য এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে সহায়তা করে। সমন্বিত প্রস্তুতি কার্যক্রমের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ ফরিদপুরসহ দেশের বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।