ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৬ বার
চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে দাম না বাড়িয়ে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়বে।
এটা কোনো সমাধান নয়। সেনাবাহিনীর সহায়তা নিলে সংকট অনেকাংশেই কেটে যেতে পারে।
দুর্যোগ বা সংকটে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার উদাহরণ থাকলেও এখন তা কেন করা হচ্ছে না সে প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
এই সংকট ঘিরে সরকারের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংকট মোকাবিলায় আমলাদের সক্ষমতার অভাবের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসছে।
একইসঙ্গে তেল সংকট কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিরোধীরা সরকারকে বিপাকে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে কি না- সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে অনেকের মত।
ঠিক একই কারণে সরকারি অরগানগুলো (প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অঙ্গ) অকার্যকর হয়ে পড়ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, সরকার যদি কার্যকর ও সক্ষম থাকতে চায়, তবে এই পরিস্থিতিকে সংসদে জরুরি অবস্থা ডিফাইন করতে হবে এবং সেনাবাহিনীকে মাঠে নামাতে হবে।
সম্প্রতি পাম্প মালিকদের সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) বৈঠকে পাম্প মালিকরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকার এখন পর্যন্ত সে প্রস্তাবে সায় দেয়নি।
অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) অভাবে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বর্তমানে লো-ফিডে চালু রয়েছে (সক্ষমতার চেয়ে অনেক ধীর গতিতে উৎপাদন চলছে)। তবে সরকার পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এবং দীর্ঘ সারি কমাতে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল পাস নামক একটি কিউআর কোডভিত্তিক অ্যাপ চালু করেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে থাকায় বাংলাদেশ এখন ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে তেল সংগ্রহের পরিকল্পনা জোরদার করেছে।
সরকার যে পরিমাণ টাকা র্ভতুকি দেয়, সিস্টেমের ত্রুটি কিংবা দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর তার সমপরিমাণ বা দ্বিগুণ অর্থ গচ্চা দিতে হয়। সুতরাং চুরি বন্ধ করা জরুরি, দাম বৃদ্ধি নয়।
এছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সরকার সেটাও জনভোগান্তির মুখে গেল ১৫ মার্চ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযানে প্রতিদিনই মিলছে টনের পর টন জ্বালানি তেল। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ৯ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে মওজুদ করা সর্বমোট জব্দ তেলের পরিমান ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪২ লিটার। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মজুতদারদের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও পাচারকারীদের তথ্য প্রদানকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতিটি জেলায় বর্তমানে বিশেষ ভিজিলেন্স টিম কাজ করছে।
এতসব উদ্যোগের পরও কাটেনি সংকট, কমেনি পেট্রোল পাম্পের দীর্ঘ লাইন।
এদিকে বুধবার (১৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাবের উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, দাম বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। ডিপো থেকে পাম্প পযর্ন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি প্রকট হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারি অরগানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটা পথ খুঁজতে হবে। সরকার যদি কার্যকর ও সক্ষম থাকতে চায়, তবে এই পরিস্থিতিকে সংসদে জরুরি অবস্থা ডিফাইন করতে হবে এবং সেনাবাহিনীকে মাঠে নামাতে হবে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী আমাদেরই সন্তান। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখছে, তাহলে কেন আমাদের সম্পদ রক্ষায় তারা ভূমিকা রাখতে পারবে না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার যে পরিমাণ টাকা র্ভতুকি দেয়, সিস্টেমের ত্রুটি কিংবা দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর তার সমপরিমাণ বা দ্বিগুণ অর্থ গচ্চা দিতে হয়। সুতরাং চুরি বন্ধ করা জরুরি, দাম বৃদ্ধি নয়।
যানজট, ঝড় জলোচ্ছ্বাস বন্যা সব ধরনের দুর্যোগে যদি সেনাবাহিনী কাজে লাগানো যায়, তাহলে এখন কেন নয়। জ্বালানি সংকট এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। এখন সেনাবাহিনী নামানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।
অন্যদিকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এস কে এম শফিকুল ইসলাম (পিএসসি) বলেন, দাম বাড়ানোর জন্য কোনো রকেট সায়েন্স জানতে হয় না। এটা সবচেয়ে সহজ সমাধান। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে একটা লিমিটেড রোল দিয়ে হলেও সেনাবাহিনীকে এনগেজ করা প্রয়োজন। কারণ আমরা দেখছি, কোনো পদক্ষেপই যেন কাজ আসছে না। এতো দীর্ঘসময় ধরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চলতে পারে না।
জ্বালানি বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার ফরিদ আহমেদ পাঠান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট কাটাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও থাকছেন। কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয়। পুলিশ র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও যুক্ত করা প্রয়োজন। এর ফলে সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে কতটা সিরিয়াস তার একটা মেসেজ সবার কাছে পৌঁছবে। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ালে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণ অসহনীয় হয়ে পড়বে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলেন, এই মুহূর্তে দাম বাড়ানো মানে হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেওয়া। সংকট উত্তরণে সেনাবাহিনী নিয়োজিত করা জরুরি। সেনাবাহিনী মাঠে নামলেই অবৈধ মওজুতদাররা আর মজুত করা তেল ধরে রাখতে পারবে না। বাজার স্বাভাবিক হতে বাধ্য। ইন এইড অব সিভিল পাওয়ার- এর আওতায় বিভিন্ন ক্রান্তিকালে সরকার সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আমার মনে হয়, এখন প্রশাসন ও অন্যান্য বাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীকেও যুক্ত করা দরকার।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে তেল নিতে আসা সাধারণ মানুষেরও অভিমত, দাম বৃদ্ধি নয়, বরং সেনাবাহিনী নামালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
এ প্রসঙ্গে তারা বলছেন, যানজট, ঝড় জলোচ্ছাস বন্যা সব ধরনের দুর্যোগে যদি সেনাবাহিনী কাজে লাগানো যায়, তাহলে এখন কেন নয়। জ্বালানি সংকট এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। এখন সেনাবাহিনী নামানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা এবং সক্ষমতা কতটুকু। এখন সরকারের উচিত, সেই সব বিষয়গুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনামাফিক ব্যবস্থা নেওয়া। দাম বাড়ানো কোনোভাবেই সংকট সমাধানের জন্য জরুরি নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেই বৈঠকে উপস্থিত এক মালিক জানিয়েছেন, তাদের বেশ কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে একটি হচ্ছে অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করে অবৈধ তেল মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এ প্রসঙ্গে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহবায়ক কাবুল বলছেন, আমরা বিশ্ববাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংকট কাটাতে সেনা অভিযানকে আমরা শতভাগ স্বাগত জানাই। যদি কোনো অবৈধ মজুত থাকে, সেগুলো সরকার খুঁজে বের করুক। যে কোনো মূল্যে আমরা চাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। জ্বালানি সংকটে কেবলমাত্র গ্রাহকের নয়, পাম্প মালিক, শ্রমিক, কর্মচারী সবারই দুর্ভোগ এখন চরমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট সরকারের জন্য একটি সুযোগও বটে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা এবং সক্ষমতা কতটুকু। এখন সরকারের উচিত, সেই সব বিষয়গুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনামাফিক ব্যবস্থা নেওয়া। দাম বাড়ানো কোনোভাবেই সংকট সমাধানের জন্য জরুরি নয়।