ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৫ মার্চ, ২০২৬ ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৫ বার
শিগগিরই বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যরা আগের পোশাকেই ফিরে যেতে পারেন এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক মতামত জরিপে।
পোশাক পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি চিঠির মাধ্যমে দেশের সব পুলিশ সদস্যের কাছে মতামত চাওয়া হলে বিপুল সংখ্যক সদস্য আগের ইউনিফর্মের পক্ষে মতামত দিয়েছে।
দেশে আনুমানিক পুলিশের সংখ্যা ২ লাখের বেশি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ আগের পুলিশের পোশাক পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছেন।
নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে পুরোনো পোশাকের পক্ষেই সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।
বুধবার (৪ মার্চ) পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের পোশাক নির্ধারণের এখতিয়ার সরকারের। বর্তমানে পুলিশের পোশাক নিয়ে যে মতামত জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
পরবর্তীতে সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পোশাক পুলিশের জন্য উপযোগী ও মানানসই। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
পুলিশের কল্যাণ সভায় পুরোনোর পোশাকের পক্ষে মত
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন পোশাক পুলিশ সদস্যদের ওপর কার্যত চাপিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই পোশাকের বিপক্ষে প্রায় ৯৬ শতাংশ পুলিশ সদস্য মতামত দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নতুন পোশাকের রঙ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর পর জেলায় জেলায় পুলিশের বিশেষ কল্যাণ সভা ডাকা হয়। সম্প্রতি নরসিংদী জেলা পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কল্যাণ সভায় উপস্থিত অধিকাংশ পুলিশ কর্মকর্তা পুনরায় পুরোনো পোশাক পরিধানের পক্ষে মত দেন এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত জেলাভিত্তিক কল্যাণ সভাগুলোতেও একই মতামত, পুরোনো পোশাক। এসব কল্যাণ সভার প্রধান হিসেবে জেলা পুলিশ সুপাররা (এসপি) নিয়ম মেনে পুলিশ সদর দপ্তরে পুরোনো পোশাকের পক্ষে মতামতের ফলাফল পাঠান।
নরসিংদীর বিশেষ কল্যাণ সভায় উপস্থিত থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের পোশাক বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক। ব্যবহারিক মান, নকশা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় পুরোনো পোশাকই সময়োপযোগী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।
পুলিশের কল্যাণ সভায় একে একে সব কর্মকর্তা আগের পোশাকের পক্ষেই মতামত প্রকাশ করেন।
নতুন পোশাক গ্রহণে অনাগ্রহ
অন্যদিকে একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৪০ শতাংশ পুলিশ সদস্য নতুন পোশাক পরিধান করতে পেরেছিলেন। শুরু থেকেই পরিচয় গোপন রেখে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নতুন পোশাকের রঙের বিপক্ষে গণমাধ্যমে মত প্রকাশ করেন। তৎকালীন সময় নতুন পোশাকের রঙ দেখে পুলিশ সদস্যরা এমনও মন্তব্য করেন, নতুন পোশাকের রঙ আসলে রুচির দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছবি। তৎকালীন সময়ে ১০০ জন পুলিশ সদস্যের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৯৫ জন নতুন পোশাক পরতে একেবারেই আগ্রহী নন ও ৫ শতাংশ সদস্য মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
প্রথমে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতে নতুন পোশাক সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে রেলওয়ে পুলিশ, শিল্প পুলিশ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে পোশাক পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
গ্রীষ্মকালীন পুরোনো ইউনিফর্মেই ফিরছে পুলিশ
সূত্র জানায়, প্রতি বছর ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত শীতকালীন পুলিশের পোশাক কার্যকর থাকে, যেখানে ফুলহাতা ইউনিফর্ম ও তার ওপর জ্যাকেট অন্তর্ভুক্ত। চলতি শীত মৌসুমে নতুন পোশাকেই আনুমানিক ৪০ শতাংশ পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে ১৬ মার্চ থেকে গ্রীষ্মকালীন পোশাক (হাফ হাতা ইউনিফর্ম) পরিধানের নিয়ম থাকলেও নতুন পুলিশের পোশাকের কোনো বরাদ্দ বা সরবরাহ এখনো নেই হয়তো বা হতে পারে পুলিশের অভক্তির কারণে বন্ধ। ফলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে পুলিশ সদস্যরা পুরোনো হাফ হাতা পোশাকেই দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি নির্দেশনা জারি হয়নি।
জরিপের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডিআইজি (কন্ট্রোলিং) মো. কামরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠিতে জেলা ভিত্তিক কল্যাণ সভা আয়োজন করে পোশাক বিষয়ে মতামত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
মোট ১,০৮,৬৪১ জন পুলিশ সদস্য মতামত দেন। এর মধ্যে—
নতুন পোশাকের পক্ষে: ৯১১ জন
অন্য কোনো পোশাকের পক্ষে: ২,৮১৭ জন ও পুরোনো পোশাকের পক্ষে সর্বোচ্চ মতামত ১,০৪,৯১৩ জন। তবে দেশজুড়ে আনুমানিক পুলিশের সংখ্যা ২ লাখ প্লাস।
পোশাক ও লোগো পরিবর্তনের পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের অংশ হিসেবে পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পুলিশের জন্য আয়রন রঙ, র্যাবের জন্য অলিভ রঙ এবং আনসারের জন্য গোল্ডেন হুইট রঙ নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া পুলিশের লোগোতেও পরিবর্তন আনা হয়। নৌকার পরিবর্তে যুক্ত করা হয় শাপলা, ধান ও গমের শীষ। তবে সূত্র জানায়, পুলিশের লোগো পরিবর্তনের পক্ষে শতভাগ সমর্থন থাকলেও নতুন ড্রেসের বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন অধিকাংশ পুলিশ সদস্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ নতুন পোশাকের রঙ নিয়ে মতামত প্রকাশ করতে না পারলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রঙ, আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো প্রকার জনমত যাচাই ছাড়াই নির্বাচিত এই পোশাকের সঙ্গে ইউনিফর্মধারী অন্যান্য সংস্থার পোশাকের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মতামত উঠে এসেছে।
বিষয়টি অ্যাসোসিয়েশনের নজরে এসেছে এবং বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন।
পুলিশের পোশাকের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন এবং ১০ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার একটি কমিটির দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের আগের পোশাকটি নির্ধারণ করেছিল। সে সময় আবহাওয়া, দিনে ও রাতে দায়িত্বপালনের সুবিধার্থে দৃশ্যমানতা, পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং এবং অন্য বাহিনীর সঙ্গে যেন সাদৃশ্য না থাকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল।