ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

পুলিশি হয়রানি ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার উপায়ঃ এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২ মার্চ, ২০২৬ ১৫:৪৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫২২ বার


পুলিশি হয়রানি ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার উপায়ঃ এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

পুলিশি হয়রানি ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার উপায়ঃ এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর 

পুলিশ রাষ্ট্রের সেবক, নাগরিকের প্রভু নয়। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন প্রতিটি নাগরিককে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা দিয়েছে। সচেতনতাই আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী কবচ।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ — বিশেষত অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ — প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার থেকে রক্ষা করে। পুলিশ সদস্যরা এই সাংবিধানিক সীমার বাইরে যেতে পারেন না। গেলে তারাও আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।

থানায় অসহযোগিতা বা দুর্ব্যবহারের শিকার হলে প্রথমেই জেনে রাখুন — পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (PRB) অনুসারে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) সকল অভিযোগ লিখিতভাবে গ্রহণ করতে আইনত বাধ্য। অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা নিজেই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তাৎক্ষণিক সাড়ার জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন — আপনার কলটি রেকর্ড হয়, যা পরবর্তীতে প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স অপারেশনস কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা সচল — ফোন ০১৩২০-০০১২৯৯ বা ০১৩২০-০০১৩০০, ইমেইল [email protected]। অনলাইনে অভিযোগ করতে চাইলে discipline.police.gov.bd পোর্টালে যান — নাম-ঠিকানা সহ বা গোপনে, দুভাবেই অভিযোগ করা যায়। প্রয়োজনে থানার OC থেকে শুরু করে সার্কেল ASP এবং জেলার SP পর্যন্ত ধাপে ধাপে লিখিত অভিযোগ দিন।

ঘুষ বা অবৈধ সুবিধা দাবি করলে ভয় পাবেন না। ঘুষ গ্রহণ বা দাবি করা দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুসারে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ — সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। মনে রাখবেন, ঘুষ দিলে আপনিও আইনত ঝুঁকিতে পড়েন এবং অপরাধীকে পার পেতে সাহায্য করেন।
দুদক হটলাইন ১০৬-এ কল করুন — এটি টোল-ফ্রি, ২৪ ঘণ্টা সচল এবং নাম ও পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ করা যায়। অনলাইনে acc.org.bd-তে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করুন। সাক্ষ্য আইন, ২০২৩ অনুসারে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ — নিরাপদে ও বিচক্ষণতার সাথে রেকর্ড করুন। SP বা DIG অফিসে বিভাগীয় অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং সাময়িক বরখাস্ত সম্ভব।

শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে জানুন — বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) সুস্পষ্টভাবে বলে, “কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না।” এটি লঙ্ঘন করা সংবিধানবিরোধী এবং দণ্ডনীয়।
এ ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হলো নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩। এই আইনে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের যেকেউ থানায় না গিয়ে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করতে পারবেন। নির্যাতনের শাস্তি ৫ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং হেফাজতে মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজার সম্মুখীন হতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। এর বাইরে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় (৭ বছর) এবং ৩৩১ ধারায় (১০ বছর) অতিরিক্ত সাজার বিধান রয়েছে।
নির্যাতনের পরপরই সরকারি হাসপাতালে গিয়ে মেডিকো-লিগ্যাল সার্টিফিকেট (MLC) সংগ্রহ করুন — এটি মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। দেরি করলে আঘাতের চিহ্ন মুছে যেতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হটলাইন ১৬১০৮ বা nhrc.org.bd-তেও অভিযোগ করতে পারেন।

বেআইনি আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩ অনুযায়ী আপনার চারটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত: গ্রেপ্তারের কারণ জানার অধিকার — কারণ না বললে গ্রেপ্তার আইনত অবৈধ; ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হওয়ার অধিকার; পছন্দের আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার অধিকার এবং পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করার অধিকার।
বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে দ্রুততম প্রতিকার হলো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগে হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করা। রিট দায়েরের পর আদালত পুলিশকে আটক ব্যক্তিকে হাজির করতে এবং আটকের আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দিতে পারেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে — আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক রাখা এই অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।

জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগের জন্য নম্বরগুলো মনে রাখুন — জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, পুলিশ কন্ট্রোল রুম ০১৩২০-০০১২৯৯, দুদক হটলাইন ১০৬, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ১৬১০৮ এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিস ১৬৪৩০।

যেকোনো পরিস্থিতিতে কিছু বিষয় সবসময় মনে রাখবেন। আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশ সদস্যের নাম, পদবি ও আইডি নম্বর চাওয়া আপনার আইনগত অধিকার — সংকোচ করবেন না। ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান ও সাক্ষীর নাম লিখে রাখুন। নিরাপদ মনে হলে ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করুন — এটি সম্পূর্ণ বৈধ। কোনো অবস্থাতেই ফাঁকা কাগজে বা না পড়ে কোনো কাগজে সই করবেন না। চাপ বা ভয় দেখিয়ে নেওয়া স্বীকারোক্তি ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬ ধারা অনুসারে আদালতে অগ্রহণযোগ্য। জটিল পরিস্থিতিতে একা না লড়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস (১৬৪৩০), BLAST বা ASK-এর মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাবেন।

আইন সবার জন্য সমান — পুলিশ পদবি কোনো অপরাধের ঢাল নয়। যে পুলিশ সদস্য আইন লঙ্ঘন করেন, তিনি যেকোনো সাধারণ নাগরিকের মতোই বিচারের মুখোমুখি হবেন। আপনার অধিকার জানুন, ভয় নয় — সঠিক পদক্ষেপ নিন, প্রমাণ সংরক্ষণ করুন এবং ন্যায়বিচার দাবি করুন। আপনি একা নন — আইন আপনার পাশে আছে।

এই তথ্যগুলো বাংলাদেশের সংবিধান, পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এবং police.gov.bd ও acc.org.bd-এর সর্বশেষ তথ্যের আলোকে প্রস্তুত। আইনের পরিবর্তন হতে পারে — সর্বশেষ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

এম. এ. এ. বাদশাহ্ আলমগীর 
Advocate 
The Subordinate Courts of Bangladesh 
Associated with practice at the High Court 
Legal Advisor, Aparadhchokh24.com
Email: [email protected]


   আরও সংবাদ