ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার
ঢাকা: ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা ও লাশ কয়েক খণ্ড করার ঘটনায় করা মামলার রায় হবে আজ রোববার (৭ জুন) সকাল ১০টায়।
রায়ে অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওহিদুজ্জামান।
তিনি বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-আদালত উত্থাপন করা হয়েছে। আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেবেন বলে আমি আশাবাদী।
শনিবার (৬ জুন) রাতে রামিসা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্মকর্তা বাংলানিউজকে এমন কথাই বলেন।
এদিকে পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানা বলছে, আদালত চত্বরে রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত ফোর্স নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ব পালন করছেন।
পল্লবী থানার এসআই ওহিদুজ্জামান বলেন, এ মামলায় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সব প্রয়োজনীয় নথি আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। মামলায় মোট ১৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন, যার মধ্যে পাঁচজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, শিশু রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ কেঁদেছে। আমার সন্তানও কেঁদেছে। আমাদের থানা কেদেছে, আমাদের পুলিশ বাহিনী কেঁদেছে। আশা করছি, আদালত রামিসা হত্যাকাণ্ডের আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেবেন।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী মামলার সব ডকুমেন্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আমার সহকর্মীরাসহ সবাই রাত দিন ২৪ ঘণ্টা মিলে অনেক কষ্ট করেছি এ মামলার জন্য।
সকালে আদালতে আমাদের কোনো কাজ নেই, তবে আদালত রায় ঘোষণা করবেন, রায় শোনার জন্যই আদালতে উপস্থিত থাকবো। রামিসার পরিবারের সদস্য, বাবাসহ আত্মীয়-স্বজন আদালতে উপস্থিত থাকতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, এ মামলার রায় দেখে ভবিষ্যতে কেউ যেন এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
এদিকে রাতে পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তবে ওই নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ইউনিটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
কোতোয়ালি থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি আদালত চত্বরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে।
পল্লবী থানার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ১৯ মে ঘটনার দিন বড় বোন রাইসা আক্তার এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিল। সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরে শিশু রামিসা। কিন্তু বড় বোন তাকে বলে, তুই একটু পরেই স্কুলে যাবি, যাওয়ার দরকার নেই। এরপর রামিসার মা রান্নাঘরে থাকা অবস্থায় রামিসাকে ডাকলে সে ভেতরে চলে যায়। তবে শিশুর মন সেখানে স্থির হয়নি। বড় বোন পাশের একটি ভবনে আত্মীয়ের বাসায় চলে গেলেও তাকে সঙ্গে নেয়নি। তখন রামিসা আবার বের হয়ে সিঁড়ির কাছে আসে, সম্ভবত বড় বোনকে দেখার জন্য। ঠিক সেই সময় পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা বাইরে বের হওয়ার সময় সিঁড়ির মুখে রামিসাকে দেখতে পেয়ে তাকে জাপটে ধরে মুখ চেপে নিজের ফ্ল্যাটের বাথরুমে নিয়ে যায়। সে সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) ঘুমিয়ে ছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে জানা যায়, বাথরুমেই রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন সোহেল রানা। সোহেল শিশুটিকে চড়, থাপ্পড়, ঘুষি ও খামচি দেন। একদিকে মারধর, অন্যদিকে ধর্ষণের ফলে শিশুটির শরীর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের কার্যক্ষমতা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও মস্তিষ্কের কিছু কার্যক্রম তখনও চলমান থাকতে পারে। এরপর গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে লাশ গুম করতে শরীরের অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
ঘটনা ঘটে যাওয়ার কিছু সময় পর সোহেল রানার স্ত্রীর ঘুম ভাঙে এবং সে বিষয়টি জানতে পারে। পরে দুজন মিলে শিশুটির দেহ খাটের নিচে রাখেন এবং মাথা একটি প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা হয়। এরপর সোহেল রানা জানালার একাংশ ভেঙে পালিয়ে যান।
তদন্তে জানা যায়, পালিয়ে যেতে তাকে সহযোগিতা করেন তার স্ত্রী। স্বপ্না তার স্বামীকে বলেছিলেন, তুমি পালিয়ে যাও, না হলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
এদিকে রামিসার মা শিশুটিকে না পেয়ে আশপাশে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সোহেল রানার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার জুতা পাওয়া যায়। এরপর স্থানীয়রা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ধারণা করা হচ্ছে ঘটনাটি সকাল ৯টা ৪০ মিনিট থেকে ১০টা ২০ মিনিটের মধ্যে ঘটে। ১১টার পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে একটি বিকাশের দোকান থেকে টাকা তোলার সময় সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শিশুটিকে হত্যার পর সোহেল রানা গাবতলী এলাকায় যান। তার উদ্দেশ্য ছিল পঞ্চগড়ে পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু টিকিট না পাওয়ায় সেখানে যেতে পারেননি। পরে বেড়িবাঁধ এলাকায় ঘোরাফেরার পর ফতুল্লায় চলে যান। একজনের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা নিয়ে তিনি কক্সবাজারে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সোহেল রানার পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। সেদিনই প্রথম সুযোগ পেয়ে তিনি রামিসাকে মুখ চেপে ধরে বাথরুমে নিয়ে যান।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রশ্ন করা হয়, আদালতে সোহেল রানা দাবি করেছেন, ডলার নামে আরও একজন এ ঘটনায় জড়িত। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এটি তার একটি কৌশল। কারাগারে থাকা কোনো বন্দির পরামর্শে তিনি অন্য নাম বলেছেন, যাতে মামলা দীর্ঘায়িত হয়।
মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয়েছে। শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ১৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
এর আগে গত ২৫ মে আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান। ওই দিনই মামলাটি পরবর্তী বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।