ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:২৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১ বার
বৈশাখের তীব্র তাপদাহে পুড়ছে দেশ। এই অস্বাভাবিক গরমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছে মারাত্মক পানির সংকট।
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় পুকুর, খাল এমনকি নদীর পানিও শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
চলমান তাপপ্রবাহে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় গভীর নলকূপ থেকেও পানি উঠছে না। অনেক স্থানে পানযোগ্য পানির স্তরই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জীবনধারণ হয়ে উঠেছে দুঃসহ।
পানি সংগ্রহ এখন উপকূলের মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নারী, পুরুষ ও শিশুরা পরিবারের জন্য সামান্য সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন। নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পুকুরের কাদামিশ্রিত পানি পান করছেন। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মিঠা পানির সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা; বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ; এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার মানুষ এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন।
পানির সন্ধানে এসব এলাকার মানুষ দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। অনেক সময় চড়া দাম দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না পানযোগ্য পানি। বিশেষ করে নারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। তাদের কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় অঞ্চলে বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রভাবশালী একটি চক্র স্লুইস গেট ও খাল-নদীর গেট ব্যবহার করে লবণ পানি প্রবেশ করাচ্ছে। এর ফলে কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে সুপেয় পানির প্রাকৃতিক উৎস। লবণাক্ততার বিস্তার পানির সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সংকট মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধান, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধভাবে লবণ পানি প্রবেশ বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

পানির জন্য প্রতিদিনের যুদ্ধ
উপকূলজুড়ে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এখন মানুষের জীবনে প্রতিদিনের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাপদাহ, লবণাক্ততা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এই সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, পানি সংগ্রহ এখন আর সাধারণ প্রয়োজন নয় বরং বেঁচে থাকার জন্য এক কঠিন সংগ্রাম।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর এলাকার বাসিন্দা রাজা গাজী জানান, খাবার পানির অভাবে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। তীব্র তাপদাহে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি নদী-নালা ও পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। পানি সংগ্রহ এখন অনেকের জন্য দৈনন্দিন যুদ্ধের মতো। ভোর হতেই নারীদের দূর-দূরান্তে ছুটতে হচ্ছে।
একই চিত্র দাকোপের উড়াবুনিয়া গ্রামেও। সেখানকার বাসিন্দা সাথী বৈদ্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে এলাকার হাজারো পরিবার। লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। তিনি জানান, দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় শুধু পানির সন্ধানে। এক কলস পানি সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার মহিষচরণী গ্রামের জুয়েল হাওলাদার জানান, এলাকায় একটি পুকুরেও এখন আর মিষ্টি পানি নেই। সব পানিতেই লবণ ঢুকে পড়েছে। বাধ্য হয়ে মানুষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কোনোভাবে পান করছে। অনেকেই সেই পানির ওপর নির্ভর করেই দিন কাটাচ্ছেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, লবণাক্ততার কারণে পুকুর ও নদীর পানি আর পানযোগ্য নেই। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা বর্ষার পানি ট্যাংকে সংরক্ষণ করতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষের সে সুযোগ নেই। ফলে শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা তীব্র পানির সংকটে পড়ে যান।
উপকূলের এই সংকট কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা না মিললে এই অঞ্চলের জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

পানি গবেষকদের সতর্কবার্তা: সংকটের পেছনে জলবায়ু ও মানবিক কারণ
উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র পানির সংকটের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পানি গবেষকরা। তাদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ত পানি সহজেই মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে বা অতিক্রম করে লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে পানির উৎসের ওপর।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, লবণাক্ততার বিস্তার উপকূলের মাটি ও পানিকে ক্রমেই অনুপযোগী করে তুলছে। অনেক এলাকায় নলকূপ থেকেও নোনা পানি উঠছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির উৎস দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির মৌসুমে কিছু মানুষ বড় ট্যাংকে পানি সংরক্ষণ করলেও সেই পানি শেষ হয়ে গেলে শুষ্ক মৌসুমে আবারও শুরু হয় সংকট। দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে পুকুর বা ডোবার পানি ফিটকিরি বা অন্যান্য উপায়ে বিশুদ্ধ করে পান করছেন। রান্না, ধোয়া-মোছা ও দৈনন্দিন অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে লবণাক্ত পানি।
পানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যান অর্গানাইজেশন ফর সোশিও-ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের (অ্যাওসেড) নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিন বাংলানিউজকে বলেন, দেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ পানি কিনে পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।
খুলনা জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মুকুলের মতে, বর্তমানে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে রয়েছেন। এ সংকটের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী নয়, মানবিক কারণও বড় ভূমিকা রাখছে।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আগে উজানের পানির প্রবাহ সাগরের লবণাক্ত পানিকে ঠেলে দূরে রাখত। কিন্তু এখন উজানের পানি কমে যাওয়ায় লবণ পানি সহজেই ভেতরে ঢুকে পড়ছে। পাশাপাশি চিংড়ি চাষের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে লবণ পানি প্রবেশ করানোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর গরম মৌসুম এলেই মিঠা পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। ট্যাংকে পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। বরং নদ-নদীতে লবণ পানি প্রবেশ বন্ধ করা এবং বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে আড়াই ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে অনেক গভীর নলকূপ থেকেও পানি উঠছে না।
অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ বলেন, উপকূলীয় উপজেলাগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। অধিকাংশ স্থানে ভূগর্ভে পানযোগ্য স্তর না থাকায় গভীর নলকূপও কার্যকর হচ্ছে না। এর ফলেই শুষ্ক মৌসুমে সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণের এই যৌথ প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।