ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ভয়াবহ মাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে নববর্ষের বৈশাখী উৎসব এই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সচেতনতা বাড়ানো এবং সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক (ছোঁয়াচে) একটি রোগ।
শরীরে র্যাশ ওঠার আগে ও পরে মিলিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৯ দিন একজন আক্রান্ত রোগী অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হামে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে বাতাসে সহজেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
হাম ‘মিজেলস’ নামের অতি-সংক্রামক ভাইরাস দ্বারা শরীরে সংক্রমিত হয়। এতে আক্রান্ত হলে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং জ্বরের চার দিন পর মুখ ও শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়।
মিজেলস ভাইরাস শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে সন্দেহজনক মোট হাম রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৫৩ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৬৩৯ জন।
এই সময়ে নিশ্চিত হামে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১৫১ জনের।
১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২২৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ছাড় পেয়েছেন ৭ হাজার ৬৫৬ জন।
অর্থাৎ, হাম ও হামের উপসর্গে এক মাসেরও কম সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮৯ জনের। যদিও জনস্বাস্থ্যবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
দেশে অল্প সময়ে এত বেশি মানুষের হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) উদযাপিত হবে বাংলা বর্ষবরণের উৎসব। এই উৎসবের বিভিন্ন আয়োজন ও ব্যাপক জনসমাগম হামের সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পহেলা বৈশাখে হামের সংক্রমণ ঝুঁকি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যেখানে বেশি লোকসমাগম হয়, সেখানে কোনো শিশু বা ব্যক্তি হামে আক্রান্ত অবস্থায় গেলে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১৬ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।
সতর্কতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের শরীরে জ্বর, ঠান্ডা, নাক দিয়ে পানি পড়া, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ রয়েছে, তারা যেন পহেলা বৈশাখের উৎসবে বাইরে না যান। এছাড়া এসব উপসর্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যারা ঘনিষ্ঠভাবে সেবা দেন, তারাও যেন বাইরে না আসেন। যেসব শিশুর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে বা আশপাশে হাম আক্রান্ত শিশু আছে, তারা যেন মাস্ক পরে বাইরে যায়।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অসুস্থ বা হামে আক্রান্ত শিশুদের কোনোভাবেই বাইরে মেলা বা জনসমাগমে নেওয়া উচিত নয়। বৈশাখের অনুষ্ঠানে প্রচুর ভিড় হয়, যেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। শিশুরা একা বের হয় না, তাদের সঙ্গে মা বা পরিবারের সদস্য থাকে, তাদেরও ভিড় এড়িয়ে চলা উচিত এবং সম্ভব হলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ছোট শিশুরা সবসময় মাস্ক পরে থাকতে পারে না, তাই তাদের ভিড় থেকে দূরে রাখাই সবচেয়ে ভালো।
পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে হামের ঝুঁকি প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, বাসায় কোনো শিশুর জ্বর বা শরীরে লালচে দাগ থাকলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এমন শিশুদের কোনোভাবেই মেলা বা ভিড়ের মধ্যে নেওয়া যাবে না। তাদের আলাদা রাখতে হবে, যাতে অন্য শিশুদের সংস্পর্শে না আসে।
তিনি আরও বলেন, হামের লক্ষণ প্রকাশের আগে ৩-৪ দিন জ্বর থাকতে পারে, তখন রোগটি বোঝা যায় না। এই সময়েও শিশুদের বাইরে নেওয়া বা অন্যদের সঙ্গে মেশানো উচিত নয়। এই পর্যায়েও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। বৈশাখের মতো বড় জনসমাগমে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়, তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দেশে বর্তমানে হামের যে উচ্চ প্রাদুর্ভাব চলছে, পহেলা বৈশাখের মতো বড় উৎসবে ব্যাপক জনসমাগম সেই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ। তাই উৎসবের আনন্দ যেন কোনো পরিবারের জন্য বিষাদে পরিণত না হয়, সেজন্য ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।