ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৭ বার
রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তিনি ও তার দল কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনা কি সত্যিই দেশে ফিরবেন নাকি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার কথা বলছেন? আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কতটা প্রস্তুত?
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জনকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চাপ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চাঙা করার পাশাপাশি তারেক রহমান সরকারকে চাপে রাখার কৌশল হতে পারে শেখ হাসিনার এই ধরনের বক্তব্য।
আবার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার এবং আদালতে আত্মসমপর্ণের পরিকল্পনার কথা জানান।
বৃহস্পতিবার টেলিফোনে তিনি এ সাক্ষাৎকার দেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রুশদ বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হয়তো আশা করেছিল বর্তমান সরকারের প্রথম সফরটা তাদের দেশেই হবে।
কিন্তু সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া এবং চীনে প্রথম গিয়েছেন। তাই এখন আমরা দেখছি শুধু ভারত সরকার নয়, সেদেশের মূলধারার মিডিয়াগুলোও বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে বিভিন্নভাবে কাজ করছে। আমার মনে হয় তাদের সেই আচরণের বহিঃপ্রকাশ বা প্রতিফলন হচ্ছে পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টিও কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সাথেও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের যোগসূত্র রয়েছে। মোট কথা বাংলাদেশকে নানামুখি চাপে রাখার কৌশল বলতে পারেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ওই দিনই জনরোষ থেকে বাঁচতে হেলিকপ্টারযোগে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর গত বছর মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করে।
এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে। একাধিক দুর্নীতির মামলাতেও আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন।
অন্যদিকে সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সরকারের ঊর্ধ্বতনরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলে আসছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে বলে জানিয়েছেন।
গত ৪ জুলাই ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আইনে বিচারের সুযোগ আছে, তবে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। তদন্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা মিলেছে বলেও জানান প্রসিকিউটর আমিনুল।
এর আগে ১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে বিচার সম্পন্ন করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
শেখ হাসিনা অপরাধ করে অন্য দেশে অবস্থান করছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাকে আমরা দেশে ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশের মাটিতে সেই বিচার সম্পন্ন করতে চাই। বাংলাদেশের জনগণও সেটাই চায়। সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
বিএনপি সরকারের পক্ষ বরাবরই বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় ভারতের কাছে তাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে।
ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে বলে সরকারের মন্ত্রীরা মাঝেমধ্যেই বলে আসছেন।
গত ২১ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসবেন, তার ফিরে আসার দাবিতে মিছিল হচ্ছে। বিষয়টি আপনারা পর্যবেক্ষণ করছেন কি না?
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমরা তো তাকে ফেরত চাই, আইনিভাবেই চাই। তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা শেখ হাসিনাকে ফেরত চাই এবং আমরা চাই তিনি মামলা ফেস করুন। এখন যদি কেউ বলে তিনি আসতে চান, আমরা তো তাকে ফেরত চাচ্ছি।’
পলাতক শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার বিষয়টি সামনে আসায় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে তিনি তৎপরতা চালাতে বা রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই অবস্থায় দেশে ফিরেই শেখ হাসিনার রাজনীতিতে অংশ নেওয়া স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়। তাকে আগে আইন-আদালতের মুখোমুখি হতে হবে, বিষয়টি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও জানেন এবং বাস্তব পরিস্থিতিও বুঝতে পারছেন।
তারপরও দলটির নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করছেন, শেখ হাসিনা তাড়াতাড়িই দেশে ফিরবেন। যদিও কবে ফিরছেন, সে ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেতাকর্মীদের কাছে নেই এবং কেউ সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলছেনও না। তবে শেখ হাসিনা দ্রুত দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে যে আলোচনা বা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, সে ধরনের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তারা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরছেন বলে মনে করছেন যারা, তারা কীভাবে এমন ধারণা করছেন, তা তারা নিজেরাই জানেন। শেখ হাসিনা এই পরিস্থিতিতে কীভাবে ফিরবেন? তার জন্য একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রয়োজন। বর্তমানে যে আলোচনা বা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সেই প্রেক্ষাপট আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা দেখছেন না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কিছুটা সক্রিয় হতে দেখা যায়। ঢাকাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল বের করতে দেখা গেছে। মিছিলে নেতাকর্মীদের সংখ্যাও বাড়ছে। ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব মিছিলে ‘শেখ হাসিনা দেশে আসছেন’, এমন স্লোগানও দেওয়া হচ্ছে। এসব মিছিলের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের ফরিদপুরের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেন। এটি অনেকটাই নিশ্চিত এবং এ বিষয়ে প্রস্তুতিও চলছে। তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন বা কোথা থেকে জানলেন—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওই নেতা জানান, তিনি দলের একাধিক নেতার কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছেন। যাদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, তারা দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পর্যায়ে রয়েছেন বলেও দাবি করেন। তার ভাষায়, এটি সঠিক খবর এবং শেখ হাসিনা আসবেন, এ তথ্যও সঠিক।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, এ বছরই শেখ হাসিনা দেশে আসছেন। সেটা ডিসেম্বরেও হতে পারে, আবার তার আগেও হতে পারে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত শেখ হাসিনা দেশে আসছেন, এমন কথা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য লিখছেন।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনা দেশে আসছেন, এমন আলোচনা বা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এর প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এই আলোচনা ও গুঞ্জনের মধ্য দিয়ে অনেকের সেই হতাশা কিছুটা হলেও কমেছে। অনেকেই রাজনৈতিকভাবে উৎসাহিত হচ্ছেন।
ওই সূত্রগুলো জানায়, গত নির্বাচনের পর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়টির ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যে যেভাবে এবং যতটুকু পারছেন, প্রকাশ্যে এসে মিছিল করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনাও রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল বের করছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও এভাবে দলকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা দেশে এসে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করবেন কি না, সে বিষয়ে দলটির নেতাকর্মীরা অন্ধকারেই রয়েছেন।