ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়াকে কেন বেছে নিলেন?

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৮ জুন, ২০২৬ ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৫ বার


প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়াকে কেন বেছে নিলেন?

সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের দুই বড় অংশীদার ভারত ও চীনকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম মালয়েশিয়া বেছে নেওয়ার পেছনে চারটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—ভারত-চীন প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য রক্ষা, শ্রমবাজার সুরক্ষা, আসিয়ানমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যমপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি। তবে সবচেয়ে বড় কারণ ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা।

এর বাইরে রয়েছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ।

 

কূটনৈতিক ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর এই মালয়েশিয়া সফর নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম বড় ‘সিগন্যাল’, যা ঢাকার ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।

 

ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে ‘নিরপেক্ষ বার্তা’
কূটনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রথম সফর যদি বেইজিং হতো, তাহলে দিল্লিতে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

আবার প্রথম সফর যদি ভারত হতো, তাহলে চীনের কাছে তা রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা দিতে পারত।

 

এমন পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া ঢাকার জন্য একটি নিরাপদ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত এড়াতেই মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সেটি ভারত-চীন প্রতিযোগিতার সরাসরি অংশ নয়। ফলে প্রথম সফরের রাজনৈতিক বার্তা অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার
বর্তমান সরকারের অন্যতম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। নতুন শ্রমিক নিয়োগ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং নতুন খাতে কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়গুলো সফরের অন্যতম আলোচ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে সফরটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রেও এ সফরের গুরুত্ব রয়েছে।

আসিয়ানের সঙ্গে সংযোগ জোরদার
মালয়েশিয়া শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। আর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে ঢাকা আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ খুঁজবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত আবেগের বিষয়ও আছে কি?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যান। দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সময় তারেক রহমানের পরিবারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি বিশেষ আবেগঘন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও সরকারি কোনো সূত্র এ বিষয়টিকে সফরের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছে না, তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সংযোগও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করতে পারে।

চীনের আগে মালয়েশিয়া: কূটনৈতিক বার্তা কী?
আগামী ২১-২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন। এরপরই তিনি সেখান থেকে চীন সফরে যাবেন।

এর ফলে ঢাকা একদিকে যেমন বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা এগিয়ে নিতে চাইছে, অন্যদিকে প্রথম সফর মালয়েশিয়ায় করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্যের বার্তাও দিতে চায়।

মালয়েশিয়া সফরে যা গুরুত্ব পাচ্ছে
বাংলাদেশের একটি বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। তবে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মধ্যে দিয়ে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে পারে।

এ ছাড়া নতুন সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে জোর দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শিল্প, অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হতে পারে।

এদিকে মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল অর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং কেন্দ্র। বাংলাদেশ হালাল পণ্য রপ্তানি, ইসলামি ফাইন্যান্স এবং শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে।

এছাড়া মালয়েশিয়া আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে আরও গভীর প্রবেশের চেষ্টা করছে। কুয়ালালামপুর সফরকে আসিয়ানভিত্তিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বৃদ্ধির একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরে মালয়েশিয়াকে কেন বেছে নিলেন - এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বাংলানিউজকে বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ভারত, চীনসহ অনেক দেশই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে এসব দেশে না গিয়ে প্রথমে তিনি মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন। এতে একটি ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ার পরেই তিনি চীনে যাবেন। হয়তো পরবর্তী সময়ে ভারতেও যাবেন। একসঙ্গে তো প্রধানমন্ত্রীর সব দেশে যাওয়া সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে অনেক দেশেই প্রধানমন্ত্রী যাবেন।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি ছাড়াও বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ ইত্যাদি খাতে সহযোগিতা রয়েছে। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।


   আরও সংবাদ