ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

নদীকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হবে

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৯ মে, ২০২৬ ০৯:১৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫ বার


নদীকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হবে

পদ্মা দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এবং অন্যতম প্রধান প্রমত্তা নদী। তবে গত কয়েক দশকে এই নদীর আচরণ ও গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।

কোথাও তীব্র ভাঙন, কোথাও আবার জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। ফলে পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা, বসতি, কৃষি ও পরিবেশ ক্রমেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন দশকে পদ্মা ধারাবাহিকভাবে তার গতিপথ ও আকার পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাতেও উঠে এসেছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পদ্মার উজান ও ভাটিতে ভাঙনপ্রবণতা বেড়েছে।

একই সঙ্গে নদীতে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে।

 

নদী গবেষকদের মতে, নদীর এই অস্থির আচরণের পেছনে মানুষের হস্তক্ষেপ, অপরিকল্পিত নদী শাসন, অতিরিক্ত বালু উত্তোলন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টিই বড় কারণ।

তাদের ভাষায়, ‘নদীকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হবে।’ অন্যথায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

 

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদন নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট দূর হবে, গড়াই, মধুমতী, বড়াল, হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও ইছামতী নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়বে, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

তবে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদনের পর থেকেই দেশের নদী গবেষক, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী থেকে শুরু করে সচেতন মহলের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই পত্রপত্রিকায় বিশ্লেষণমূলক কলাম ছাপা হচ্ছে। টেলিভিশন-অনলাইন মিডিয়ার টকশোতে পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা উঠে আসছে। 

নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, পদ্মা ব্যারেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, পদ্মার বর্তমান সংকটের মূল সূত্রপাত ঐতিহাসিক ফারাক্কা বাঁধের কারণে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে লবণাক্ততা বেড়েছে, মাছের বিচরণ কমেছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক মরফোলজি স্টাডি গবেষক ও নদী বিশেষজ্ঞ এআরএম খালেকুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজের চ্যালেঞ্জ অনেক। এই ব্যারেজ নির্মাণের পর ভারত যদি ফারাক্কা ব্যারেজ সরিয়ে নেয়, তাহলে আমরা কি সেই প্রবাহ সামাল দিতে পারব? আবার ব্যারেজের গোড়ায় বিপুল পরিমাণ পলি ও বালি জমা হবে। নিয়মিত ড্রেজিং না করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।’

বালু অপসারণের এই পক্রিয়া অনেক ব্যয়বহুল বলেও উল্লেখ করেন খালেকুজ্জামান। তবে জলবিদ্যুৎ তৈরির বিষয়ে সরকারের উদ্যোগে দেশের উপকার হবে বলেও মনে করেন তিনি।

তবে সামগ্রিকভাবে এই পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন এই গবেষক। তিনি বলেন, ‘নদীকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হয়। নদীর স্বাভাবিক চরিত্রকে জোর করে আটকে দিলে তার প্রতিক্রিয়া প্রকৃতিই দেখাবে।’

সম্প্রতি আইডব্লিউএম ও বুয়েটের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকেও পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। ওই বৈঠকে বুয়েটের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. মনজুর রহমান বলেন, পদ্মা ও মেঘনার মতো বড় নদীতে যত্রতত্র বালু উত্তোলন এবং অপরিকল্পিত নদী শাসন ভাঙনকে আরও উসকে দিচ্ছে। ড্রেজিংয়ের নামে নদীর তলদেশ যেভাবে খনন করা হয়, তা নদীর স্বাভাবিক গঠনপ্রকৃতি নষ্ট করছে। নদীকে সুস্থ রাখতে হলে তার স্বাভাবিক চ্যানেল সচল রাখতে হবে।

পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরাও বলছেন, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় নদীতে ব্যারেজ নির্মাণের ফলে উল্টো নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পদ্মায় ভাঙনের তুলনায় চর জাগার পরিমাণ বেশি ছিল। ওই সময়ে প্রতিবছর গড়ে ৯০৮ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হলেও বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৫৬৮ হেক্টর জমি চর হিসেবে জেগে উঠেছে। মোট হিসাবে প্রায় ৬ হাজার ৬০১ হেক্টর নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে।

তবে গবেষকরা বলছেন, নতুন জেগে ওঠা চরগুলোর বেশিরভাগই ব্যবহার অনুপযোগী। বিপরীতে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে বসতি, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট ও নানা অবকাঠামো। ফলে নতুন চর জাগা ভাঙনের ক্ষতি পূরণ করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার মতো গতিশীল নদীকে কেবল অবকাঠামো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, ড্রেজিং ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে এখন যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় ধরনের শঙ্কাও। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।


   আরও সংবাদ